৯ আগ, ২০১০

ব্রা মানেই বিপদ



এই ব্লগটি শিক্ষামূলক। গাড়ী চালনা, চক্ষু নিয়ন্ত্রন এবং ব্রা বিষয়ক সংযম সংক্রান্ত বেশ কিছু শিক্ষনীয় নীতিবাক্য আপনারা এখানে পাবেন।

আমি তখন আমেরিকার জর্জিয়ায় অজ পাড়াগাঁর এক সামরিক ঘাটিতে আছি। আমার ইউনিটেই আছে আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত সেনাসদস্য ডিন ডেভলিন। সিগারেট আর নারীলিপ্সার এক জীবন্ত কিংবদন্তি সে। তার সেই কীর্তিকান্ডের গল্প পরে একদিন করা যাবে। আজ অন্য গল্প। ডিন ডেভলিনের কাজ তখন এক বিশাল হামভি (হামার গাড়ীর সশস্ত্র সামরিক ভার্সন) চালিয়ে সেই সেনা ঘাটির পথ ঘাট দাপিয়ে বেড়ানো। এই দেখে আমার শখ হলো সেই হামভি একবার নিজে চালিয়ে দেখা। আমাকে খুশী রাখতে ডিনের কোন আপত্তি নেই। আমিও আমার মিলিটারি বসদের বলে কয়ে আমার শখ মেটানোর পার্মিশন নিয়ে নিলাম। ব্যস, এক বিকেলে অফিস শেষ করে ডিনকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। ঘটনার সুত্রপাত এখানেই।

বেশ কিছুদুর হামভি চালিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। চালাচ্ছি আর বনজঙ্গল ঘেরা ঘাটির রাস্তার আশে পাশের বৈকালিক প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছি। তখন গ্রীষ্মকাল। স্নিগ্ধ বিকেল। হঠাৎ দেখলাম বিকেলের সোনারোদে রাস্তার পাশের এক সবুজ ঘাসের লনে গোলাপী ব্রা পরিহিতা অর্ধবসনা এক তরুনী আধশোয়া ভঙ্গিতে সূর্যস্নান করছে। নারীলিপ্সু ডিনের মনে হলো এক্ষুনি গাড়ী থামিয়ে সেই অর্ধবসনাকে তার জিজ্ঞেস করা উচিত “আমি কি কোন সাহা্য্য করতে পারি?” আমি সেই গোলাপী ব্রার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই ভাবছিলাম দুনিয়ায় এতো কিছু থাকতে ব্যাটা ডিনের কেন মনে হলো যে তার কাছ থেকে সেই তরুনীর কোন সাহায্য প্রয়োজন এবং অর্ধবসনা হয়ে সূর্যস্নানের সাথে কোন ব্যাটা ছেলের সাহায্য করতে চাওয়ার সম্পর্কটাই বা কি। হঠাৎ এক ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পেলাম। অতি মনযোগের সাথে ব্রা দেখতে গিয়ে রাস্তার বাঁকটাই খেয়াল করিনি। পনেরো-বিশ ফূট উঁচু এক রোড সাইন ততক্ষনে আমার হামভির ধাক্কায় পপাত ধরনীতল।

পুলিশ এলো। গাড়ীর তেমন কিছুই হয়নি। বিশালাকৃতির রোড সাইনের ধ্বংসসাধনই আমাদের ব্রা পর্যবেক্ষনের প্রধান পরিণতি। ঘটনার আকস্মিকতায় ব্রা, অর্ধবসনা তরুনী, বিকেলের সোনারোদ- সব কিছুই মন থেকে ধুয়ে মুছে গেল। পুলিশ পুলিশের মতো বিচার বিশ্লেষন করে নির্ধারন করলো এটি একটি প্রশিক্ষণকালীন “সামরিক দুর্ঘটনা”। ব্যস, কেস সেখানেই খতম। আর কোন ঝামেলা রইলো না। আমরাও স্বস্তিতে বাড়ী ফিরে এলাম। তবে সেই থেকে শিক্ষা হলো গাড়ী চালাতে গিয়ে ব্রা দেখা মোটেই নিরাপদ কোন কর্ম নয়। 

চোর পালালে যেমন বুদ্ধি বাড়ে, তেমনি দুর্ঘটনার পর তা এড়ানোর যা যা কলাকৌশল আমার জানা ছিল তা সবই মনে পড়তে থাকলো। বাংলাদেশে গাড়ী চালানোর নির্ভুল কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক ড্রাইভার আমাকে বলেছিল, ব মানেই বিপদ, তাই ব দেখলেই ব্রেক। এই ব গুলো হলো বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাস্তায় বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর-ই সব বিপদের উৎস। বুড়া, বাচ্চা, বাছুর আর বাজারের আমজনতা গাড়ীর সামনে কখন কি করে বসে তার কোন গ্যারান্টি নাই। তাই বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর দেখা মাত্রই জলদি ব্রেক কষে গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।  ব দেখে ব্রেক কষলেই সব মুশকিল আসান। আমি খুব ভালো ভাবে এই তত্ব মুখস্ত করে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝলাম ড্রাইভার সাহেবের তত্ত্বে বিশাক এক ফাঁক রয়ে গেছে। ব’তে ব্রা-ও হয়। তিনি যদি বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর এর সাথে ব্রা বিষয়ক সতর্কবানী যুক্ত করে দিতেন, তাহলে আমি আজ ব্রা দেখেই ব্রেক কষে দিতাম এবং ব্রা দেখতে গিয়ে আমার এই “সামরিক দুর্ঘটনা”ও ঘটতো না।

ব্রেক কষে না হয় গাড়ীর নিয়ন্ত্রন হলো, কিন্তু মনেরর নিয়ন্ত্রনের কি ব্যবস্থা? এই বিষয়েও কিন্তু আমার কিছু জানা ছিল। বাবার বদলীর সুবাদে বছরের মাঝখানে গিয়ে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছি নতুন এক স্কুলে। নতুন জায়গা, নতুন স্কুল- সব কিছুই অচেনা। ধর্মশিক্ষা ক্লাসে তাই উদাস হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফেলে আসা স্কুল আর বন্ধুদের কথা ভাবছিলাম। ক্লাসের জানালা দিয়ে তাকালেই এক বাড়ীর ছাঁদ। কোন কুক্ষনে সেই ছাদে তখন স্নান সেরে ভেজা শরীরে কাপড় নাড়তে এসেছে এক কাজের বুয়া। খোদার কসম, আমার সেদিকে মোটেই নজর ছিলনা। আমি শুধু স্মৃতিকাতরতায় উদাস হয়ে জানালা দিয়ে আকাশ পানে চেয়েছিলাম।  কিন্তু ধর্মক্লাসের মৌলভী স্যার আমার বাহিরের দৃস্টি ও ভেজা শরীরে ছাদে বুয়ার আগমন একসাথে লক্ষ্য করলেন। যার মনে যেই খেয়াল। তিনি ক্লাস ভর্তি ছেলে মেয়ের সামনে আমার নাম ধরে বললেন, “শোন মাইনুদ্দীন, মনে রাখবা চক্ষুরও জেনা আছে।” । এই নিয়ে সেই স্কুলে বাকী দিনগুলো আমার নানা টিটকারী ও গঞ্জনার মধ্যে জীবন কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু হায়, তবু মাইনুদ্দীন সেই কথা মনে রাখে নাই। চক্ষুর জেনা করতে গিয়েই তো আজ এই দশা।

জনকল্যাণের জন্য আমার এই শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা ব্লগে প্রকাশ করলাম। দেশে বিদেশে যেসব তরুন বন্ধুরা গাড়ী চালান তাদের জন্য পরামর্শঃ ব দিয়ে বিপদ কিন্তু শুধুমাত্র ৪টি নয়; ব দিয়ে বিপদ ৫টি। বুড়া, বাচ্চা, বাছুর, বাজার এবং ব্রা। আর সব কিছুর পাশাপাশি ব্রা দেখিলেও সাবধান! গাড়ী নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মনের উপরও নিয়ন্ত্রন থাকা চাই। কিন্তু যৌবনের মন কি আর কথা শোনে? তাই চাই চক্ষুর উপর নিয়ন্ত্রন। আফসোস, মাইনুদ্দীন মনে রাখে নাই। কিন্তু আপনারা মনে রাখবেনঃ চক্ষুরও কিন্তু জেনা আছে।

ব্রা মানেই বিপদ
৯ই আগস্ট ২০১০
নক্সভিল
, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

৬ আগ, ২০১০

সঙবাদ



খবরঃ
 জাতীয় সংগীতকে মোবাইল ফোনে রিং টোন হিসেবে এবং তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। (প্রথম আলো)

বুঝলাম আইনের ভিত্তিতেই এই আদেশ। কিন্তু রিট মামলা যে দায়ের করলো তার প্রাণে কি গান নাই? সঙ্গীত ভালোবাসার  জিনিস। দেশপ্রেমও ভালোবাসার জিনিস। ভালোবেসে তা আমি আমার ফোনে ব্যবহার করলে সমস্যা কি?  কিন্তু সে রকম আইনী শ্রদ্ধা দেখাতে হলে তো ফেসবুকের অনেকের প্রোফাইল ফটোতে রাখা জাতীয় পতাকার ছবিও নিষিদ্ধ করে দিতে হয়। সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা দেখিয়ে দুরত্ব বজায় রেখে চলা আর ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়ার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বললে আমি ভালোবেসে কাছেই টেনে নিতে চাইবো। পাড়ার মুরব্বী খালাম্মাদের আমি সন্মান দেখিয়ে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে দুরত্ব বজায় রেখে চলি। আর পাশের বাড়ীর সুন্দরী প্রেয়সীকে কাছে টেনে নিয়ে চুমু খাই। তুমি খাল্লামা হতে চাও নাকি প্রেয়সী?

খবরঃ দেশের সর্বত্র জামায়াতের নতুন সদস্য সংগ্রহ কমে গেছে, শুধু পাবনায় কমেনি। (প্রথম আলো)

হেমায়েতপুর গারদ তো পাবনায়। তাইলে আর সদস্য সংগ্রহ কমবে কেমনে? হেমায়েতপুরের গারদে নিশ্চয়ই এবার তুমুল মাত্রায় জামায়াতের সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলেছে। দৃশ্যকল্পটা হতে পারে এরকমঃ
জামায়াত কর্মীঃ
  ও মতি মিয়া, তুমি কি জামায়াতের সদস্য হইতে চাও?
মতি পাগলাঃ অবশ্যই হইতে চাই। গারদ থেইকা বার হইয়া আমি ইনশাল্লাহ মাওলানা মনি সিং-এর নেতৃত্বে দেশে ইসলামী বিপ্লব করবো।
জামায়াত কর্মীঃ আলহাদুলিল্লাহ
, তুমি হইলা সদস্য নম্বর ৪২০।

খবরঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের জনৈকা শিক্ষিকাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদাবনতি ও বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। (প্রথম আলো)

সহযোগী অধ্যাপক সাহেব বিভাগীয় সভাপতি হইয়া যাবার পর আর নিশ্চয়ই ক্লাস নিতে পারতেছিলেন না। ছাত্রীর অভাবে তাই ধরছিলেন শিক্ষিকারে। এখন জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক হিসাবে জুনিয়র ক্লাসের কচি কচি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষকতা করবেন। ধর্ষকের জন্য তো এটা প্রমোশন! আসল প্রশ্ন হলোঃ এই অধ্যাপক মিয়ার চাকরি টিকলো কেমনে? নাকি ১০০ ধর্ষণের মানিক মিয়ার সেঞ্চুরী রেকর্ড দেখার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে  উনার যৌন নিপীড়ন এখন “ও কিছু নয়, সবে তো মাত্র রানের খাতা খুললো”!

খবরঃ নিঊইয়র্কের এক বাংলাদেশী সম্মেলনে সাবেক যাযাদি সম্পাদক শফিক রেহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের ডিবি পুলিশ পুলিশী হেফাজতে আমার গোপনাঙ্গ দেখতে চেয়েছিল। পুরুষ পুলিশ পুরুষের গোপনাঙ্গ দেখে কী আনন্দ পায়?” (সাপ্তাহিক আজকাল)

বড়ই যৌক্তিক প্রশ্ন। স্মৃতিভ্রষ্ট হবার কারনে হয়তো শফিক রেহমানের আজ এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। কিন্তু এর উত্তর বোধহয় আমি জানি। বছর পনের আগের চালু থাকা এক গল্পের কথা মনে করা দরকার। গল্পটা এমনঃ এক আরব শেখ তাঁর বিলাস বহুল প্রমোদ ভবনে সুন্দরী বিলেতি যুবতীকে নিয়ে মৌজ়মাস্তিতে ব্যস্ত। মৌজ-মাস্তির এক একান্ত ঘনিষ্ট পর্যায়ে আরব শেখের গোপনাঙ্গের বিশাল আকৃতি দেখে বিমোহি্ত বিলেতি ললনা বিস্মিত কন্ঠে বললো, “ওয়াও”।আরব শেখ তখন যুবতীর আরবী গ্রামাটিকেল মিসটেক সংশোধন করে দিয়ে বললেন, “ আকৃতিতে এটা ওয়াও নয়, এটা আলিফ”। যতদুর মনে পড়ে, এই গল্প বাজারে এনেছিলেন শফিক রেহমান নিজেই তার যাযাদি কলামে। শফিক সাহেব হয়তো ভুলে গেছেন, কিন্তু ডিবি পুলিশ এখনো ভুলনি। তারা হয়তো একটু চেক করে দেখতে চেয়েছিল শফিক সাহেবেরটা ওয়াও না আলিফ।

সঙবাদ ১
৬ই আগস্ট, ২০১০
নক্সভিল, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

৫ আগ, ২০১০

অলক্ষুণে কবিতা

জীবনে কোন না কোন সময় সব মানুষই নাকি একবার হলেও কবি হয়। আমিও হয়েছিলাম। কাঁচাহাতে লেখা কৈশোরের দুর্বল কবিতা, কিন্তু তাতেই আমার জীবন ঝালাপালা। নব্বুই-একানব্বইয়ের দিককার ঘটনা। আমি সবে মাত্র মাধ্যমিকের পাট চুকিয়েছি। মফস্বল শহরে বন্ধুত্বের বৃত্তে চলছে জীবন। বন্ধুদের কেউ নব্য বিপ্লবী --- বামপন্থায় দীক্ষা নিচ্ছে। কেউ বা নব্য কবি --- কাব্য সাধনায় ব্যস্ত। এদের মাঝে বেমানান আমি ক্রীড়ামোদী তরুণ --- খেলাধুলো করে হেসে খেলে জীবন কাটানোর গোপন স্বপ্নে বিভোর। নব্য বিপ্লবী আর নব্য কবি বন্ধুরা তাদের বন্ধুচক্রে এই সৃস্টিহীন ক্রীড়া-প্রেমীর উপদ্রব মেনে নিতে নারাজ। দুই পক্ষের প্রভাবে আমি আধা-বিপ্লবী আর আধা-কবি হয়ে কোন কুক্ষণে যেন লিখে ফেললাম জীবনের প্রথম কবিতা। আর যায় কোথায়? কাঁচা হাতের লিখা এই কবিতাই আলী আবু আম্মুরীর অলক্ষুণে জুতো হয়ে দেখা দিল আমার জীবনে।

সেই সময়ই কোথা থেকে যেন একবার সঞ্জীব চৌধুরী নামে বিপ্লব আর শিল্পের যৌথ-সত্ত্বার এক মানুষ (তিনি তখনো দলছুটের সঞ্জীব হয়ে উঠেননি) এসে হাজির হলেন আমাদের বিপ্লবী আর কবি বন্ধুদের আড্ডায়। বন্ধুরা তাদের কৃতিত্বের গল্প শোনালো: আমার মতো সৃস্টিহীন মানুষও কিভাবে তাদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সম্প্রতি এক কবিতা ঝেড়ে ফেলেছে। কথায় কথায় সেই কবিতা পড়লো সঞ্জীব চৌধুরীর হাতে, যিনি তা পড়লেন এবং ফেরার সময় পকেটে ভরে নিয়ে চলে গেলেন ঢাকায়। সপ্তাহ খানিক পর জানা গেল ঢাকা থেকে ছাত্র ইউনিয়নের একুশের প্রকাশনা জয়ধ্বনিতে ছাপা হয়েছে আমার সেই অলক্ষুণে কবিতা। বন্ধুরা বলল, “ওরে, ছাড় তোর খেলাধুলা, তুই তো এখন কবি”।

বন্ধুরা হৈ হৈ করে সেই জয়ধ্বনির কপি নিয়ে গেল কলেজ সাময়িকীর দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপকের কাছে। তিনি সেটা আবার ছাপিয়ে দিলেন কলেজ বার্ষিকীতে। সেই কলেজ বার্ষিকী গিয়ে পড়লো কলেজের এক সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর হাতে, যে কিনা আবার সেই কবিতা নিয়ে উঠে গেল কলেজের সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আবৃত্তি মঞ্চে। সেই কবিতা এরপর আর কোথাও গিয়ে পড়লো না, বরং আমিই আহ্লাদে গদগদ হয়ে গিয়ে পড়লাম সেই সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর প্রেমে। প্রেমে তো পড়লাম, কিন্তু ভীরু মনে প্রেম নিবেদনের সাহস আর হয়ে উঠে না। একবার ভাবলাম কাব্যের ভাষায় বলি। কিন্তু কাব্যের কোলে আশ্রয় মিলল না - বেরুলো না একটি শব্দও। বেরুবে কিভাবে-বন্ধুদের সমতুল্য হবার তাড়া থেকেই না কোন কুক্ষণে লিখেছিলাম সেই একটা মাত্র কবিতা। অতঃপর ভাবলাম এবার না হয় সেই সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর সমতুল্য হবার চেষ্টা করে দেখি যদি প্রেম নিবেদনের কোন কুল-কিনারা করা যায়। ব্যস, লাটে উঠলো আমার খেলাধুলা, বিপ্লব, কাব্য সবকিছুই। মন ডুবালাম পড়াশোনায়। তবে প্রেমের মরা যেমন জলে ডুবে না, আমিও ডুবলাম না। বরং ভেসে উঠলাম উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকায়। কি প্রেমেই না পড়েছিলাম! আগডুম-বাগডুম করে গিয়ে দাঁড়ালাম সেই মেয়ের সামনে। মনে বড় আশা, এককালীন সাময়িকীতে ছাপা হওয়া আমার কাব্য প্রতিভা আর আজকের পত্রিকায় ছাপা হওয়া আমার কৃতিত্বের ছবি মিলিয়ে আমাতে মুগ্ধ হয়ে সেই মেয়ে নিশ্চয়ই আজ নিজ থেকেই ভালোবাসা-ভালোলাগার গল্প-কথা কিছু বলবে। মেয়ে নিজ থেকেই বলল। ভালোবাসার গল্পই বলল। তবে সে গল্পের নায়ক অন্য কেউ। ভালোবাসার এই গল্পে আমার অবস্থা যেন সেই মক্কাবাসীর মতো যে মক্কায় থেকেও হজ্বের আসর ধরতে পারেনি।

হতাশ হৃদয়। খেলাধুলোয় আর মন বসলো না। ফিরে গেলাম বিপ্লবী বন্ধু আর কবি বন্ধুদের মাঝে কাব্য আর বিপ্লবের সন্ধানে। বন্ধুরা বলল, “ওরে, ছাড় তোর কাব্য আর বিপ্লব, তুই তো এখন মেধাবী”। অবশেষে সেই সিল নিয়েই পড়াশোনার নিরস জগতে মুসাফিরের মতো ঘুরে বেরাতে থাকলাম। আজও সেই পথে পথে ঘোরা সেই হয়নি। বরং এই দুপুর বেলায় কঠিন এক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পড়ার টেবিলে বসে মনে হল- আমার খেলাধুলার সেই আমোদিত জীবন কেড়ে নিলো এক অলক্ষুণে কবিতা। জীবনে ওই একবারই লিখেছিলাম। সেই প্রথম, সেই শেষ। এই সেই অলক্ষুণে কবিতা। শালার এই কবিতার মায়েরে বাপ!

দাবী

বায়ান্নতে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, ভাষা চাই।
বিধাতা ভাষা দিলেন।

একাত্তরে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, স্বাধীনতা চাই।
বিধাতা স্বাধীনতা দিলেন।

নব্বুইতে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, গণতন্ত্র চাই।
বিধাতা গণতন্ত্র দিলেন।

যদিও বিধাতার মেনে নেয়া দাবীগুলোর
ঘটাতে পারিনি বিকাশ
তবুও এক গভীর রাতে
শত যুগের, শত শতাব্দীর প্রত্যাখ্যাত
সেই একটি মাত্র দাবী নিয়ে দাঁড়ালাম বিধাতার কাছে
বললাম, অন্ন চাই, অন্ন চাই, অন্ন চাই।
বিধাতা বলেন,
অন্ন নয়; অন্য কথা বলো।

৪ জানু, ২০০৯

এরশাদ বাংলার অলংকার

এরশাদের দাবী আওয়ামী লীগ তাঁকে কথা দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখন বলছে না। সুনীলের বরুণা কথা রাখেনি। এখন এরশাদের হাসিনাও কথা রাখছে না।
কথা ছিল দিন বদলের, কথা বদলের তো কথা ছিল না। এমনই যখন পরিস্থিতি, একটু ভেবেই দেখা যাক এরশাদ রাষ্ট্রপতি হলে আমাদের উপরি পাওনা কি।
জাতীয় পার্টির বহুল ব্যবহৃত এক শ্লোগান- “কে বলছে স্বৈরাচার, এরশাদ বাংলার অলঙ্কার”। এমন খাঁটি গিনি সোনার অলঙ্কার ধূলার ধরণীতে হেলায় ফেলে রাখা বড্ড অন্যায়। তাঁর মতো “আমিন জুয়েলার্স” মার্কা গুণীজনের জন্য বঙ্গভবনের আলো ঝলমলে শোরুমই যোগ্য স্থান।
৭৮ বছরের চিরতরুণ এই এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপতি হলে আমরা বোনাস হিসেবে যা যা পেতে পারি:
১) প্রতি বিষ্যুদবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবন থেকে বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর । সচলায়তনের যে সব কবিবৃন্দ কর্তৃপক্ষের লৌহ-শাসনের বেড়াজালে দিনের পর দিন অচল পয়সা হয়ে পড়ে রয়েছেন, তাদের জীবনে আতকা নাজিল হয়ে যাবে সৌভাগ্যের অর্ডিন্যান্স। অচল কঠিন পদার্থরূপ থেকে তথাকথিত সচলদের তরলতাকে কাঁচকলা দেখি এক ধাক্কায় বিটিভির সৌজন্যে হয়ে যাবেন বায়বীয়- বাংলার আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াবে আপনার অমোঘ বাণী- “কাঠবেরালি কাঠবেরালি, তৈল কি তুমি খাও”।
২) সুযোগবঞ্চিত শিল্পী-অভিনেত্রীদের জন্য তৈরি হবে উপরে ওঠার শর্টকাট সিঁড়ি। মঞ্চ, চলচ্চিত্র, এনটিভি, আরটিভি, এটিএন, চ্যানেল আই, আর, এস—কোন চ্যানেলেই সুযোগ না পেয়ে যেসব ললনারা দিশা হারিয়ে আজ বিদিশা, তাদের জন্য চালু হয়ে যাবে বঙ্গভবনের সৌজন্যে চ্যানেল খাসমহল। নাচ হবে, গান হবে, হবে খাস মহলের শুটিং। উপরে ওঠার এ আসলেই এক শর্টকাট পথ- ৭৮ বছরের পুরানো, ওজনে একটু ভারী অলংকার গায়ে চড়িয়ে শুটিং হবে, কিন্তু তিন চার মিনিটেই শট ওকে হয়ে যাবার চান্সই বেশী।
৩) সমস্যাসঙ্কুল নিরানন্দ জীবনে আমরা পাবো নিয়মিত পাবো রসের উপাদান
বেকার রাষ্ট্রপতি—সুতরাং তিনি আটরশী থেকে বেনারসি দূর-দূরান্ত ভ্রমণ করবেন। তিনি জুম্মাবারে নারী বদলের মতো করে মসজিদ বদল করবেন। হয়তো বা শীতের রাতে বাদশাহ হারুনুর রশিদ হয়ে কম্বল হাতে নিয়ে কমলাপুর, গুলিস্তানের পথে পথে হাঁটবেন। প্রতিটি ঘটনা ঘটবে, আর সচলায়তনের পাতা ভরে উঠবে রচনা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়ায়।
ইত্যাদি আরো কত কি!
সংসদীয় ব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রপতিই পালন করেন আলঙ্কারিক ভূমিকা, কিন্তু আর কেউই এরশাদের মতো স্বয়ং অলঙ্কার নহেন।আসুন আলঙ্কারিক পদে আমরা এক অলঙ্কারকেই অধিষ্ঠিত করি।
বিঃ দ্রঃ সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত








১৪ ফেব, ২০০৮

রক্তাক্ত মধ্য ফেব্রুয়ারির স্মৃতি

আজ মধ্য ফেব্রুয়ারি।
১৯৮৩-র এই দিনে শিক্ষাভবন অভিমুখে আয়োজিত মিছিলের উপর পুলিশের ট্রাক চালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয় জাফর, জয়নাল, আইয়ূব, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ নাম না জানা আরও বেশ কিছু ছাত্রকে। বছর দুয়েক পর এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হত্যা করা হয় রাউফুন বসুনিয়াকে।

নব্বুই-এর দশকে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে বেড়ে উঠার সময় পত্রিকার পাতায় স্মৃতিচারণ থেকেই জেনে ছিলাম স্বৈরশাসনের সূচনালগ্নের সেই প্রতিবাদ মুখর উত্তাল দিনগুলোর কথা। ভালোবাসা দিবসের উন্মাদনায় আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে সেই প্রতিবাদী সময়ের স্মৃতি, হারিয়ে গেছে সেই “রক্তাক্ত মধ্য ফেব্রুয়ারি” শব্দ-গুচ্ছটি।

সেই সময়ে স্মৃতি ছোঁয়া একটি কবিতা।
কবিতার নাম “তোমাকে মনে পড়ে যায়”। কবি মোহন রায়হান।
শিমুল মুস্তাফার কণ্ঠে আবৃত্তিতেই ফিরে পেয়েছি এই পুরনো কবিতা।


মধুর ক্যান্টিনে যাই
অরুণের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।

তোমার সেই সদা হাসিমাখা ফুল্ল ঠোঁট,
উজ্জ্বল চোখের দ্যুতি
সারাক্ষণ চোখে চোখে ভাসে
বুঝি এখনই সংগ্রাম পরিষদের মিছিল শুরু করার তাগিদ দিবে তুমি

ওই তো, ওই তো সবার আগে তুমি মিছিলে
কি সুঠাম তোমার এগিয়ে যাবার ভঙ্গিমা
প্রতিটি পা ফেলছ কি দৃঢ় প্রত্যয়ে
কি উচ্চকিত তোমার কণ্ঠের শ্লোগান
যেন আকাশ ফেটে পড়বে নিনাদে
হাত উঠছে হাত নামছে
মাথা ঝুঁকছে ঘাড় দুলছে চুল উড়ছে বাতাসে
ওই তো, ওই তো আমাদের ঐক্যের পতাকা হাতে এগিয়ে যাচ্ছ তুমি

মধুর ক্যান্টিনে যাই
নিত্য নতুন প্রোগ্রাম, মিছিল সভা বটতলা
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দুর্জয় শপথ
সামরিক জান্তার ছোবল থেকে
শিক্ষাজীবন, শিক্ষাঙ্গনের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার অঙ্গীকারে
ডাক দেই দেশবাসীকে

তোমারি মত নিরাপত্বাহীনতায়
প্রতিটি ছাত্রের দুর্বিষহ জিম্মীজীবন এখনো এ ক্যাম্পাসে
হলে গেটে গেটে পড়ে থাকে ভয়ংকর বিস্ফোরন্মোখ তাজা বোমা
প্রতিদিন চর দখলের মত হল দখলের হিংস্র মহড়া
গুলি ও বোমা ফাটার শব্দ
এখনো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ
এ অস্ত্রের উৎস কোথায়?

মধুর ক্যান্টিনে যাই
প্রতিদিন আমাদের জীবন হাতের মুঠোয়
প্রতিদিন হামলা রুখতে হয়
বসু, আজ সেই প্রতিরোধের সারিতে তুমি নেই
আজ বড়ই অভাব অনুভব করছি তোমার

শিক্ষাভবন অভিমুখে সামরিক শাসন ভাঙ্গার প্রথম মিছিলে তুমি ছিলে
রক্তাক্ত ১৪ই ফেব্রুয়ারির কাফেলায় তুমি ছিলে
৪ঠা আগস্ট সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের কবল থেকে
আমাদের পবিত্র মাটি রক্ষা করার সম্মুখ সমরে তুমি ছিলে
এমন কোন ধর্মঘট, হরতাল, ঘেরাও, মিছিল আন্দোলন নেই যে তুমি ছিলে না

সেই নৃশংস ঘাতক রাতেও
তুমি অস্ত্রধারীদের দুর্গের দিকে অবিচল যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলে
ঘাতক বুলেট ভেদ করে গেছে তোমাকে
কিন্তু তুমি পিছু হটোনি
তুমি বীর, তুমি সাহসী যোদ্ধা, তুমি সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান
যুগে যুগে সংগ্রামীদের অফুরান প্রেরণা

মধুর ক্যান্টিনে যাই
অরুণের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।

কাউন্টারের সামনে কতদিন
তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খেয়েছি
কতদিন তুমি আমাকে চায়ের পয়সা দিতে দাওনি
কতদিন চায়ের সঙ্গে একটি সিঙ্গারা বা কেকের আবদার করেছ
কতদিন তোমার সঙ্গে খোশগল্প হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছি
বসু, আজ সব কথা মনে পড়ে যায়।

রিপার বিয়েতে তুমি বলেছিলে
অ্যাকশনে আপনার আর আগে থাকার দরকার নেই,
আমরা তো আছি
বসু, তুমি রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে সে কথা প্রমাণ করে গেলে
বসু, তুমি আমার শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার একটি রক্তকরবী বৃক্ষ

মধুর ক্যান্টিনে যাই
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।

তোমার মৃত্যুর সেই নৃশংস ঘাতক রাত্রিতে
আমি ছিলাম ঢাকার বাইরে
তোমার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ আমি দেখিনি
তোমার মৃত্যুর খবর শুনে
বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল মন
তবু সেই রাত্রেই আড়াই-শত মাইল দূর থেকে
সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা দিয়েছিলাম
তোমার হত্যার প্রতিশোধ নিতে
তোমার খুনিদের রক্তে হাত রাঙ্গাতে

বসু, আমরা বহুবার তোমার হত্যার প্রতিশোধ নেবার শপথ গ্রহণ করেছি
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে, শহীদ মিনারে, বটতলায়, বায়তুল মোকারমে,
সারাদেশ তোমার হত্যার বদলা চায়
কিন্তু এখনো তোমার খুনিরা প্রকাশ্যে সগর্বে ঘুরে বেড়ায়
এখনো তোমার ঘাতকেরা ক্ষমতার কালো কেদারায় বসে
রাইফেল তাক করে আছে আমাদের প্রতি

বসু, আমাদের শিক্ষানীতি এখনো বদলায়নি
সামরিক খাতে ব্যয় শিক্ষাখাতের চেয়ে আরও বেড়েছে
নতুন নতুন ক্যান্টনমেন্ট তৈরির পরিকল্পনা হলেও
সংস্কারের অভাবে জগন্নাথ হলের জীর্ণ ছাদ ধ্বসে
তোমার অনেক বন্ধু মারা গেছে
এখনো হলে হলে মেধা-ভিত্তিক সিট বণ্টন চালু হয়নি

বসু, তুমি এসবের পরিবর্তন চেয়ে জীবন দিয়েছ
কিন্তু আমরা এখন তোমার একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে পারিনি
বসু, আমরা তোমার কাঙ্ক্ষিত লড়াই চূড়ান্ত করতে পারিনি
আমরা তোমার হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারিনি
আমরা এখনো অজস্র বসু হতে পারিনি বলেই...

মধুর ক্যান্টিনে যাই
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।
খুব মনে পড়ে।

১৮ ডিসে, ২০০৭

ফিরে দেখা: সঞ্জীব চৌধুরী

সঞ্জীব চৌধুরী- আমাদের সঞ্জীব-দা'র কিছু ভিডিও ক্লিপ আমার হাতে এসেছিল। সবই মুলতঃ বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানের খণ্ডাংশ। এর মাঝে কিছু ছিল সঞ্জীব-দা'র অভিনীত সম্ভবত: একমাত্র নাটকের অংশবিশেষ। সেসব দিয়েই "ইন মেমোরি অব সঞ্জীব চৌধুরী" শিরোনামে ইউটিউবে ছোট ছোট ৮ পর্বের একটি ভিডিও সিরিজ আপলোড করেছি। তারই একটি এখানে সংযুক্ত করে দিলাম:

১১ মে, ২০০৭

ছোটদের সহজ ক্রিকেট অধিনায়কত্ব শিক্ষা


ছোটদের সহজ ক্রিকেট অধিনায়কত্ব শিক্ষা

প্রনেতাঃ জনৈক অভিজ্ঞ অধিনায়ক
উৎসর্গঃ হাবিবুল বাশার


ছোট্ট বন্ধুরা, আজ আমি তোমাদের ক্রিকেট খেলার অধিনায়কত্ব করার সহজ নিয়ম শিখাবো। ক্রিকেট খেলা একটি মজার বিষয়। ক্রিকেট খেলায় অধিনায়কত্ব করা তো আরো মজার। তবে তার জন্য কিছু নিয়ম মুখস্ত করতে হয়। এসব নিয়ম মুখস্ত করে নিলে তোমারা যে কেউই ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হতে পারবে।

ভালো ভাবে বোলিং পরিবর্তন করতে হলে তোমাকে একটা তালিকা মুখস্ত করতে হবে। খেলার আগের রাত্রেই কে কোন ওভার বল করবে তার একটা তালিকা বানিয়ে যথাসম্ভব ভালো করে মুখস্থ করে নিবে। এই তালিকা মুখস্থ থাকলে খেলা চলাকালীন বোলিং পরিবর্তন খুব সহজ হয়ে যাবে।

৫০ ওভারের বোলিং তালিকা তো অনেক বড়—সেটার কিছু অংশ খেলার সময় তুমি ভুলে যেতেই পারো। তালিকার কোন অংশ হঠাৎ ভুলে গেলে একদমই ঘাবড়ে যাবে না। যদি তালিকার কোন অংশ মনে না থাকে, তবে সেই ভুলে যাওয়া অংশে ৬ষ্ঠ বোলার ব্যবহার করবে। কোন অবস্থাতেই ভুলে যাওয়া অংশে নিয়মিত বোলার ব্যবহার করে নির্ধারিত তালিকা গড়বড় করে ফেলবে না।

রক্ষণাত্মক ফিল্ডিং-এর একটা চার্ট বানিয়ে তা খুবই ভালো করে মুখস্থ করে রাখবে। এটা একবার ভালো করে মুখস্থ হয়ে গেলে ফিল্ডিং সেট-আপ নিয়ে সারাজীবনে আর কোন ঝামেলা থাকবে না। যে কোন খেলা এই একই ফিল্ডিং চার্ট ব্যবহার করে চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

যদি আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর ইচ্ছে হয়, তবে ফিল্ডিং-এর চার্টটাকেই বজায় রেখে সব ফিল্ডারদের ২-পা করে এগিয়ে এসে দাঁড়াতে বলবে। যদি অতি আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর ইচ্ছে হয়, সেক্ষেত্রে সব ফিল্ডারদের অরিজিনাল ফিল্ডিং চার্টের অবস্থান থেকে ৪-পা ভেতরে এনে দাঁড় করাবে। তবে আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর এই শখ যত পরিহার করে চলা যায় ততই মঙ্গল। মনে রাখবে, “ডিফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট অফেন্স”।

আজকাল ক্রিকেটবিজ্ঞ ব্যক্তিরা সবাই বলে, খেলার সময় মানসিক চাপে না ভুগে ক্রিকেট খেলাটাকে তুমি যত বেশী উপভোগ করবে, তোমার নিজের খেলাও তত ভালো হবে। অধিনায়কত্বের ব্যাপারেও এই এক-ই কথা প্রযোজ্য। খেলার পরিস্থিতি-ফরিস্থিতি এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করে যাবে। বাকি সব কাজ সামাল দেয়ার জন্য ওভার প্রতি বোলার তালিকা এবং ফিল্ডিং সেট-আপ চার্ট তো হাতে থাকছেই।

মাঠে ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা অধিনায়কের অবশ্য কর্তব্য। মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের কাছে গিয়ে তাদের বোনের বিয়ে, বড় ভাইয়ের চাকরি-বাকরি, ছোটভাইয়ের পড়াশোনা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বদা কুশলাদি জিজ্ঞাসা করবে। মাঠে খেলা চলাকালীন সময়ে পালা করে সব খেলোয়াড়কে কাঁধে হাত রেখে স্নেহের সুরে “এই তুই পানি খাবি রে?” , “এই তুই বাথরুমে যাবি রে?” ইত্যাদি সৌজন্যতা অবশ্যই দেখাবে। এছাড়া একজন বোলার টানা ৩ ওভার বল করার পর তাঁর কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে “বেশ, বেশ” জাতীয় উদ্দীপনামুলক কথাবার্তা বলবে।

আক্রমনাত্মক মানসিকতা কেবল শত্রুতাই তৈরী করে। গান্ধীজীর মতো অহিংস নীতি পালন করে দল পরিচালনা করবে। ব্যাটসম্যানের ইনিংসের হায়াতের মালিক আল্লাহতায়ালা। কে কখন আঊট হবে তা খোদা তায়ালাই জানেন। তাই আক্রমনাত্মক মানসিকতায় দল পরিচালনা করে অহেতুক শত্রু বাড়িয়ে ফায়দা কি? মনে রাখবে, বিশাল বটবৃক্ষ ঝড়ে ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু শত ঝড়েও লতা গাছের কিছু হয়না। তাই লতা গাছের মত কোমল অধিনায়ক হবে—প্রতিপক্ষ খেলার মাঠে যতই ঝড় তুলুক, তাতে তোমার কিছুই আসে যাবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, প্রতিপক্ষের ভালো ব্যাটসম্যান ও বোলারদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা দেখাবে। তুমি নিজে যত ভালো ব্যাটিংই পারো না কেন, একজন ভালো বোলার কোন না কোন ভাবে তোমার উইকেট নিয়ে নিবেই। সুতরাং, উইকেট হারাবার আগে তাড়াতাড়ি ২/৩ টা বাউন্ডারী মেরে যে কয়টা রান তোলা যায়-সেটাই ফায়দা। একইভাবে, তুমি যে ভাবেই ফিল্ডিং সাজাও না কেন, একজন ভালো ব্যাটসম্যান রান করবেই। সুতরাং বাউন্ডারী ঠেকিয়ে তার রান তোলার গতি যত কমনো যায় ততই মঙ্গল। মনে রাখবে, একজন ভালো ব্যাটসম্যান যদি লেংড়াতে লেংড়াতেও মাঠে আসে- সে কিন্তু সবসময় একই রকম বিপদজ্জনক। লেংড়া হোক বা খোড়া হোক, ফিজিক্যাল কন্ডিশন ইজ টেম্পোরারী, বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।


পাঠক প্রতিক্রিয়া
নামঃ আনিজা খাতুন, পেশাঃ ভিক্ষাবৃত্তি, এলাকাঃ ফার্মগেট



হালার ব্যাটায় এডা লেখছে কি? হে তো ছোড পোলাপানের মাথাডা খাইবো। এমুন কইরা নি মাইনষে ক্যাপ্টেনিং করে? ব্যাটা ডরাইল্লা ভাম। আমি নিজেও তো হের থেইক্কা ভালো ক্যাপ্টেনিং করতে পারুম। আমার ব্যাট লাগবো না—হাতের এই লাঠি দিয়াই আমি তার থেইক্কা বেশী রান করুম। আর এই বুইড়া শরীর লইয়া দৌড়াইলেও আমি তার থেইক্কা কম রান আঊট হমু।

আর ফিল্ডিং সাজানি? আমি তো ফিল্ডিং সাজাইয়াই ভাত খাই। আমার লগের পিচ্চি পোলাপানগো ফার্মগেটে কারে কোন মাথায় খাড়া করাইলে ভিক্ষা বেশী পাওন যাইবো
—হেইডা আমি ঠিক করি। এডা খেলার ফিল্ডিং সাজানির থেইক্কা কম কি? হেই ডরাইল্লা ভামের মতন ফিল্ডিং সাজাইলে আমার আর খাইয়া পইড়া বাচন লাগতো না। মাইনষে দয়া কইরা কে কখন ভিক্ষা দিবো—হেই আশায় বইয়া থাকলে না খাইয়া এতদিনে আমার পেটকি লাইগা যাইতো। আমার ভিক্ষার ফিল্ডিং হইলো গিয়া এটাকিং। পোলাপান সেট কইরা এমুন মতন লাগাইয়া থুই—হালার আমারে ভিক্ষা না দিয়া মদন তোমারা যাইবা কই?  আপনে যত কিপটা ব্যাডাই হন না ক্যা, আমি আমার কাম ঠিক-এ সাইরা লই। অই ডরাইল্লা ভামের বদলে আমি ক্যাপ্টেনিং করলে খবর কইরা দিতাম--- এমন পেচকি মারা ফিল্ডিং সাজাইতাম, মাঙ্গের চান্দু, আমারে উইকেটটা না দিয়া যাইতা কই!!

তয় খালি একখান কথা
—আমারে ক্যাপ্টেন বানাইয়া দলে নিলে আমার কিন্তু অইসব “ওয়ানডে ক্যাপ” দিয়া পোসাইবো না। আমার লাগবো “ওয়ানডে ওড়না”। কইয়া দিলাম কিন্তু।

ছোটদের সহজ ক্রিকেট অধিনায়কত্ব শিক্ষা
১১ই মে, ২০০৭
অস্টিন, টেক্সাস
বাংলাক্রিকেট-ডট-কম ফোরামে প্রথম প্রকাশিত