১৯ সেপ, ২০১১

ভূমিকম্পে ঘরে না বাইরে থাকবেন?



আজ সকালে (আমেরিকার সময় ১৯শে সেপ্টেম্বর সকাল) বাংলাদেশে তীব্রমাত্রার ভূমিকম্পের খবর পেয়েই বাংলাদেশের টিভি চালিয়ে দেখলাম ভূমিকম্পে আতঙ্কিত মানুষের বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তার নেমে আশ্রয় নেয়ার খবর। ফোনে দেশে বিভিন্ন জায়গায় পরিচিতজনের খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম বাসা-রাস্তা-বাসা রাউন্ড ট্রিপ দৌড়াদৌড়ি শেষে সবাই এখন নিরাপদে নিজ গৃহকোণে ফিরে এসেছে। দেশে ছোটবেলায় আমারও এমন বেশ কয়েকবার ভূকম্পনজনিত দৌড়াদৌড়ির অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ভুমিকম্প মানেই ছিল রাতবিরাতে লম্ফঝম্ফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা। তবে সময়ের সাথে মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে আর তার স্বাক্ষর হিসেবে এবার কিছু ব্যতিক্রমও এবার দেখলাম। যেমন একবন্ধু ভুমিকম্প চলাকালে দৌড়াদৌড়ি বাদ দিয়ে ছিল ফেসবুকে লাইভ আপডেট দেয়ার কাজে ব্যস্ত । আবার অন্য এক বুদ্ধিমতী তরুণী ভূমিকম্প শুরু হবার সাথে সাথেই শুরু করেছিল বাসার ছাদ অভিমুখে বিপরীতমুখী যাত্রা। চারিদিকে বহুতল ভবন ঘেরা নাগরিক জঙ্গলে নিচে নেমে আসার চাইতে তার উপরে উঠে যাওয়াই নিরাপদ মনে হয়েছিল! তবে এই রকম প্রতিভা এখনো দেশে বিরল। প্রায় সবাই এখনো ঘর ছেড়ে বাহিরে নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার কৌশলই আঁকড়ে রেখেছে। কিন্তু ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসা কি আসলেই নিরাপদ?

এ বিষয়ে একটু খোঁজ খবর করে যা জানা যাচ্ছেঃ ভূমিকম্পের সময় আমাদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসাটাই স্বাভাবিক প্রবণতা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতামত কিন্তু এর উলটো। গবেষনায় দেখা গেছেঃ ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময়েই মানুষ দেয়ালে চাপা পড়ে বা উপর থকে পড়ন্ত বস্তুর আঘাতে সবচেয়ে বেশী হতাহত হয়। তাই রেডক্রস ও উন্নত বিশ্বের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা সহ সরকারী-বেসরকারী নানা সংগঠন এখন ভুমিকম্পের সময় আত্মরক্ষার জন্য ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন নামের একটি উপায়কেই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে মনে করে। ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন পদ্ধতি অনুযায়ী ভূমিকম্প অনুভূত হবার সাথে সাথেই বসে পড়ে (ড্রপ) টেবিল, বিছানা বা আসবাবপত্রের মতো মজবুত জিনিসের নিচে আশ্রয় নিয়ে (কাভার) সেই জিনিসটিকে অর্থাৎ টেবিল বা আসবাবপত্রের কোন অংশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে (হোল্ড অন) ।. এসময় ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করাটা বিপদজনক। অতীতে ঘটে যাওয়া নানা ভূমিকম্পে জীবনহানির কারন বিশ্লেষনে দেখা যায় ঘরের দরজা আর বহির্মূখী দেয়াল ভেঙ্গেই বেশীর ভাগ সময় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া উপর থেকে পড়ন্ত ভারী বস্তু কিংবা ধারালো জিনিসের আঘাতে আহত বা জীবন হারানো আশঙ্কা থেকে থাকে। যেমন ১৯৩৩ সালে দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহত ১২০ জনের অধিকাংশই মারা গিয়েছিল ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘরের বহির্মূখী দেয়ালের ধ্বসে চাপা পড়ে।

আমেরিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ফেমার ওয়েবসাইটে ভূমিকম্পের সময় করণীয় বিষয়ের একটি সুন্দর তালিকা দেয়া আছে। ভূমিকম্পের সময় আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে খোঁজ-খবর করলে বিভিন্ন সংগঠনের ওয়েব সাইটেও মূলত এই একই রকম পরামর্শ পাওয়া যাবে। এই পরমর্শগুলোর বেশীর ভাগই ক্যালিফোর্নিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত গবেষনার ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরী করা হয়েছেঃ ভূমিকম্পের সময় যদি আপনি নিজ বাসার বা অন্য কোন ভবনের ভিতরে থাকেন তাহলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবেন না। ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন পদ্ধতিতে মজবুত কোন কিছুর নিচে সাথে সাথে আশ্রয় নিন। যদি মজবুত কোন কিছুর নিচে আশ্রয় নেয়ার উপায় না থাকে, তবে মাথা ও মুখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেলে ঘরের অভ্যন্তরের কোন দেয়ালের কোণে (যেমন দুই রুমের মাঝের দেয়ালের কোণ) কুঁকড়ে বসে পড়তে হবে। কোন অবস্থাতেই জানালা, কাঁচের জিনিসপত্র ও বহির্মুখী দেয়ালের কাছে থাকা যাবে না। এছাড়া উঁচু ভারী জিনিস যেমন আলমারী, বইয়ের তাক ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে। ভূমিকম্পের সময় যদি আপনি বিছানায় শোয়া অবস্থায় থাকেন এবং মূহুর্তের মধ্যে ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন অবস্থানে যাওয়া না যায়, তাহলে বালিশ জাতীয় কিছু দিয়ে মাথা ঢেকে বিছানা আঁকড়ে শুয়ে থাকতে হবে। তবে বিছানার উপরে যদি সিলিং ফ্যানের মতো ভারী কিছু থাকে, তাহলে বিছানা থেকে অবশ্যই নেমে পড়তে হবে। ভূকম্পন পুরোপুরি থেমে না যাওয়া পর্যন্ত ঘরের ভিতর নিরাপদ অবস্থানে বসে থাকতে হবে। ভুমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে হাঁটাচলা ফেরা করাও বিপদজ্জনক। ঘরের ভেতরে নিরাপদ অবস্থান বেছে নিয়ে সেখানেই বসে থাকুন। ভূকম্পনের সময় কেবল ১০ফুট দুরত্ব অতিক্রম করলেও হতাহত হবার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। তাই যত কম দুরত্বের মধ্যে নিরাপদ অবস্থান নিতে হবে। ভূমিকম্পের সময় যদি আপনি ঘরের বাহিরে অবস্থান করেন তাহলে ঘরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন না। ভূমিকম্পের সময় ঘরের বাহিরের দেয়াল বা প্রবেশ পথ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। যথাসম্ভব খোলা জায়গায় বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকুন। অন্য বিল্ডিং, দেয়াল, রাস্তার বৈদ্যুতিক তার বা বাতির কাছ থাকে দূরে থাকুন।



ইদানিং ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন পদ্ধতির বিপরীতে ট্রায়াঙ্গাল অব লাইফ নামের একটি বিতর্কিত আত্মরক্ষার পদ্ধতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। এই মতানুসারে টেবিল, বা আসবাবপত্রের মতো মজবুত জিনিসের নিচে আশ্রয় না নিয়ে বরং সেটার পাশে অবস্থান নিতে হবে। দেয়াল বা ভবন ভেঙ্গে পড়ে টেবিল বা আসবাবপত্র ভেঙ্গে গেলেও সেটার পাশে একটা ত্রিভূজাকৃতির ফাঁকা স্থান তৈরী হয়। এই ত্রিভূজাকৃতির ফাঁকা স্থানটার নামই হলো ট্রায়াঙ্গাল অব লাইফ যা ভূমিকম্পের সময় দেয়াল বা ভবন ধ্বসের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে যথাযথহ নির্মাণ নীতিমালা মেনে ঘর বাড়ি তৈরী হয় যেখানে না আর তাই দেয়াল বা ভবন ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা থাকে বেশী। দাবী করা হয় এসব ক্ষেত্রে ট্রায়াঙ্গাল অব লাইফ পদ্ধতি নাকি বেশী কার্যকর। তবে রেডক্রস এবং সরকারী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো ট্রায়াঙ্গাল অব লাইফ পদ্ধতিকে স্রেফ ভাওতাবাজী ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে গন্য করে।

উন্নত বিশ্বে আধুনিক নির্মান প্রযুক্তি ও ভবন নির্মান নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ ভূমিকম্পের সময় ভবন সম্পুর্ন ধ্বসে পড়ার ঝুঁকি একেবারেই কমিয়ে ফেলেছে। এসব দেশের সুঠাম ভবন কাঠামোর ভিতরে অবস্থান করে ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন পদ্ধতি অনুসরন করা ভুমিকম্পের সময় আত্মরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে বের না হওয়া এবং বাহিরের থেকে থাকলে ঘর বা কোন ভবনে ঢোকার চেষ্টা না করার এই পাশ্চত্য পরামর্শ কি আমাদের মতো দেশে প্রযোজ্য? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বাড়ি নির্মাণের যথাযথ নীতিমালা অনেকক্ষেত্রেই মানা হয় না। বাংলাদেশে ১৯৫২ সালের ভবন নির্মান নীতিমালা আধুনিকায়ন ও সংশোধন করা হয় ১৯৯৩ সালে। তবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ভবন নির্মান নীতিমালা প্রনয়নের আগে তৈরী অসংখ্য পুরোনো বা ঘরবাড়ী। ২০০৮-৯ সালে খাদ্য ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয়ের জরীপে দেখা গেছে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৭৯ হাজার ভবন রয়েছে যা ৬-মাত্রার মাঝারী মানের ভুমিকম্পে সামাল দিতে অক্ষম। এই অবস্থায় আমরা ঘরের বাইরে আসবো না ভিতরে থাকবো?

ভারত সরকার ও ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে ভারতের শহরগুলোতে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য গৃহিত কর্মসূচীর আওতায় ভুমিকম্পের সময় করণীয় হিসেবে ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন পদ্ধতি অনুসরণ করতে পরামর্শ দেয়া হয়। বাংলাদেশের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর ভূমিকম্প বিষয়ে গণসচেতনতা বুকলেটও ঘরের ভেতরে মজবুত জিনিসের নিচে আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়। ১৯শে সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত দৈনিক কালের কন্ঠের প্রতিবেদনে নগর ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামালও ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন। তার মতে আমাদের উচিত ভূমিকম্প চলাকালে ঘর থেকে বের না হয়ে কলাম ও বিমের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া। অথবা দরজার চৌকাঠের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা। ঘরে শক্ত টেবিল থাকলে তার পায়া ধরে নিচে গিয়ে বসে থাকা। কম্পন শেষ হওয়ার পরে ঘর থেকে বের হয়ে খোলা মাঠে কিংবা নিরাপদ জায়গায় যাওয়া। তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরের অধিকাংশ অফিস-আদালত ও বাসাবাড়ি থেকে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ সিঁড়ি দিয়ে বাইরে নেমে এসেছে। মাঝারি বা তীব্রতর ভূমিকম্পই হোক না কেন, সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে আসা ঠিক নয়। এভাবে মাঝারিমাত্রার ভূমিকম্পে ভবন ভেঙে পড়ে না। কিন্তু এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। ২০০১ সালে ঢাকার অদূরে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামার সময় প্রায় ১০০ জনের মতো কয়েদি আহত হয়েছিল। আবার ২০০৮ সালে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকায় ৪.৫ মাত্রায় ভূমিকম্পের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে নামতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছিলেন।

দেখা যাচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশের সরকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের মতামত ভূমিকম্পের সময় ঘরে অবস্থানের পক্ষে। এর যৌক্তিকতা গতকালের টিভি রিপোর্টে সাধারন মানুষের মতামতের মধ্যেই ফুটে উঠতে দেখেছি। এক মহিলাকে বলতে শুনলাম বাসা থেকে বেরিয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করাও উনি ভবন-দূরবর্তী কোন খোলা জায়গা খুজে পাননি। ইটকাঠের জঙ্গলে ঢাকা শহরে এমন খোলা জায়গা আসলেই দুর্লভ। এছাড়াও আছে মাথার উপরে খোলা বৈদ্যুতিক তারের মরণ ফাঁদ। স্বাভাবিক সময়েই নির্মানাধীন ভবন থেকে ইট খুলে পড়ে যেখানে রাস্তায় পথচারীর মৃত্যু হয়ে, সেখানে ভূমিকম্পের প্রলয়লীলা ঘটলে বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নামে আসা মানুষের ভাগ্যে যে কি ঘটতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ভুমিকম্পে বাড়ির দেয়াল ধ্বসে পড়লেও ঘরের ভেতরই হতাহত হবার ঝুঁকি থাকবে তুলনামূলক ভাবে কম।

ঝড়, বৃষ্টির, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগে আমরা ঘরে ফিরে আসি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। সামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃংখলার মাঝেও নিজ গৃহকোণ হয়ে উঠে অনেকের নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু আমাদের পায়ের নিচের মাটিও যখন আক্ষরিক অর্থে কেঁপে উঠে ভূমিকম্পের আঘাতে, সেই চিরচেনা আশ্রয়ের জায়গাটিকে ভূলে যাবেন না। নাগরিক জীবনের এই ইট-কাঠের জঙ্গলে ভূমিকম্পের সময় ঘরে থাকুন। 

ভূমিকম্পের সময় বাড়িতে থাকবেন না বেরিয়ে আসবেন?
৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১১
নক্সভিল, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে
 প্রথম প্রকাশিত



১২ ফেব, ২০১১

স্বাগতম, হে ভারতীয় ক্রিকেট দল


হাতে লেখালেখির সময় কম। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন সাইটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমার পুরানো লেখাগুলো নিজের এই ব্লগের জড়ো করছি। নিচের রম্যগদ্যটি বাংলাদেশে ২০১১ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরুর দিন কয়েক আগে খেলা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তখন খুব সাজ সাজ রব। আয়োজক কর্তৃপক্ষ দেশের দারিদ্রের সব চিহ্ন বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত অতিথিদের দৃষ্টিসীমার বাইরে জন্য নানা কসরত করেছে। রাজপথের পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা বস্তি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। পথের পাশা দিয়ে বয়ে চলা ময়লা নর্দমা রাস্তার দু-পাশে পর্দা টানিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। মুল সড়ক গুলো থেকে হকার ও ভিখিরিদের ঝাটিয়ে খেদানো হচ্ছে। এই সাজ-সজ্জার উৎসবে আমরা সবাই সাড়া দিয়েছিলাম বিপুল উদ্দীপনায়। একটি মাসের জন্য আমরা ভুলে যেতে চাইলাম না-পাওয়ার সব হাহাকার। ক্রিকেট দলকে নিয়েও আমাদের আশা তখন সীমাহীন। সেই পটভূমিতেই তৈরি এই লেখাটি।


স্বাগতম, হে ভারতীয় ক্রিকেট দল, বাংলাদেশের মাটিতে আপনাদের সুস্বাগতম। 
অনুগ্রহ করে আপনারা বাংলাদেশে আপনাদের পদধূলি দিয়েছেন, সেই জন্য আমরা বড়ই আহ্লাদিত। আপনারা পাড়ার বড় ভাই, গরীবের মাঠে এসে খেলবেন- এ যে আমাদের জন্য কি সম্মান তা বলে বুঝানো যাবে না। আপনাদের রাজবাড়ীতে গত বারো বছরে একবারও নেমতন্ন না পেলেও আমরা মাইন্ড খাইনা। আমাদের সীমান্ত-কন্যা ফেলানীকে কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় গুলি করে মেরে ফেললেও আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে খুশীতে বগল বাজাই আপনাদের সরি শুনেই। কারণ মানী লোকের মান আমরা বুঝি। সম্মানী লোকের সাথে কিভাবে সম্ভ্রম আর বিনয়ের সাথে ব্যবহার করতে হয়, তা আমরা জানি। আর আমরা জানি বড়লোকের চলাফেরা হয় বড়লোকের সাথে এবং ধনীর বাড়িতে ধনীর আগমনই শোভা পায়। আপনারা যে আমাদের ভাঙ্গা দুয়ারে এসেছেন, তাতেই আমরা আনন্দে আটখানা। আপনাদের আদর, আপ্যায়ন, আদর, সমাদরে আমরা কোন কমতি রাখবো না। দেশবাসীর পক্ষে বিনম্র চিত্তে, হে ভারতীয় দল, আপনাদের জানাই সশ্রদ্ধ সম্ভাষণ।

আপনাদের এবং আরও বিদেশী অতিথিদের সমাদরের জন্য আমরা চেষ্টার কমতি রাখি নাই। চট্টগ্রামে রাস্তার পাশের বস্তি ভেঙ্গে সব নোংরা আদমি লাথি মেরে ভাগিয়ে দিয়েছি। পচা আবর্জনা, নর্দমা এসব দেখে আপনাদের সুবাসিত মুড যাতে যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, সেজন্য যোজন যোজন পথ আমরা সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ঢেকে দিয়েছি। আপনাদের মনের বলিউডি সৌরভ যাতে ফিকে না হয়, সে জন্যে ঢাকা শহর থেকে ভিখারি ঠেঙ্গিয়ে আমরা বিদায় করেছি। বাড়ীর মালিক আর গাড়ীর মালিক সবাইকে বলে দিয়েছি রঙ মাখিয়ে সব ফিটফাট করে ফেলার জন্য। এখন শুধু বাকি রেখেছি আপনাদের সফরের সময় লুঙ্গী পড়া নিষিদ্ধ করতে আর মানুষকে শার্ট-প্যান্ট ইন করে চলাফেরায় বাধ্য করতে। আপনারা চাইলে বিশ্বকাপের সময় মহিলাদের বিশেষ তারযুক্ত ব্রা পড়াও বাধ্যতামূলক করে দিতে পারি, যাতে সুউচ্চ বক্ষ-যুগল আমাদের উন্নয়নের গ্রাফটা ঠিক মতো তুলে ধরতে পারে। মোদ্দা কথা, আপনাদের স্বাগত জানানোর জন্য আমরা চেষ্টা-চরিত্রের কিছু বাকি রাখি নাই।

তবে কিনা ইয়ে, আমাদের ক্রিকেট দলের পোলাপান গুলোকে আমরা এখনো ঠিক মতো আদব কায়দা শিখিয়ে উঠতে পারি নাই। বুঝেনই তো এই যুগের বখে যাওয়া পোলাপান...বড্ড বেয়াদব। আদব সম্ভ্রম রেখে কথা কইতে জানে না। তাই আগে ভাগেই আপনাদের একটু ভেতরের খবর জানিয়ে রাখি। মাঠে যদি এরা কোন বেয়াদবী করে ফেলে, আমাদের মাফ করবেন।

আর বলবেন না...এদের নিয়ে আর পারি না। এই যে ধরেন সেদিনকার পোলা তামিম। বেয়াদবের এক শেষ। আপনাদের সম্মানের কপালে হিসি করে দিয়ে দেখবেন হয়তো ধুরুম ধারুম করে ব্যাট চালানো শুরু করবে। ২০০৭-এ জহির খান সাহেবের মতো মানীগুণী মানুষকে চোর মারার মতো বাইন্ধ্যা ধইরা পিটালো। এ ছেলে এই কবছরে আরও বখে গেছে। মাইরের উপর এর আর কোন কথা নাই। এই বখাটে ছেলের ব্যবহারে দয়া করে কিছু মনে নিবেন না। কথায় বলে, সঙ্গদোষে স্বভাব নষ্ট। বেয়াদপ তামিমের লাই পেয়ে পেয়ে ইমরুলের মতো ভদ্র ছেলেও এই কবছরে বখে ভীমরুল হয়ে গেছে। এর সাথে আরও আছে জুনায়েদ, নাফিস এগুলা। ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো তিন নাম্বার পজিশনে ব্যাটিং করতে এসে ফাল দিতে এরাও কম যায় না।

ভারতকে ধরে দিবানি বলে আরেক বদমাশ মাশরাফী আপনাদের ২০০৭-এ ঠিক জায়গা মতো ভরে দিয়েছিল। অসভ্যের এক শেষ। তবে মানীর মান আল্লাহ রাখে...এই বদমাশ এবার মাঠের বাইরে। কিন্তু এই কলি কালে দুশমনের কি অভাব আছে। কোথাকার কোন কাইল্যা রুবেল, চিকনা সফিউল, পাতলা নাজমুল...সবগুলো বেত্তমিজ কিন্তু একসাথে গ্যাং বানিয়েছে। শোনা যায়, কোন এক ফিরিঙ্গি কোচ ইয়ান পন্টের পাল্লায় পড়ে এরা নাকি হয়েছে আরও ডেয়ারিং। বাটার-ফ্লাই নামের কি এক যেন বোলিং নিয়ে এরা দিনভর এখন কেবল শ্রী শ্রী প্রজাপতেয় নমঃ বলে চিল্লা ফাল্লা করে। বলে কিনা, প্রজাপতি এবার রেডি, ভারতের সাঙ্গা হবে সাঙ্গা

আরও আছে বিশ্বসেরা রংবাজ মাগুরার পোলা সাকিব। দেখতে ভদ্র লাগে, আসলে কিন্তু মিচকা শয়তান। এইটাই হলো পালের গোদা। এর পিছে পিছে ঘুরে নাসিকা-উস্ফলিত রাজ্জাক, সারাক্ষণ যেন উইকেটের গন্ধ শুকে বেড়ায়। স্পিনের আসর বসিয়ে আপনাদের মান-সম্ভ্রমকে এরা নাচের বাইজী বানিয়ে নাচানোর ফন্দি ফিকির করতে পারে। একটু দেখে শুনে চলবেন কিন্তু।

সাঙ্গপাঙ্গের কিন্তু এখানেই শেষ না। একদল আছে ফিল্ডিং এর সময় চক্কর মারে। ফিরিঙ্গি কোচ জুলিয়ান ফাউন্টেইন নাকি এদের দিয়ে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বানিয়েছে। এই কালপ্রিট দলেই আছে শুভ্র নামের ফটকা মৌলভী। লেবাস দেখে কিন্তু ভুল করবেন না। দাড়িওয়ালা-টুপিপড়া এই জঙ্গি যদি ফিল্ডিং এর সময় বল হাতে পেয়ে ওটাকে বোমা মনে করে বসে, তাহলে আল্লাহ মালুম, আপনাদের উইকেট, টুইকেট উড়িয়ে কিন্তু জিহাদ শুরু করে দিতে পারে। দয়া করে প্লিজ রান নিবেন খুব খেয়াল কইরা

পুরানা ফটকাবাজ আশরাফুল তো আছেই...সারাক্ষণ খালি দে উপ্তা কইরা দে বলে ফাকা আওয়াজ ছুড়ে। সম্ভ্রান্ত লোকজনের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, এত দিনেও ঠিক মতো শিখে নাই। আর আছে উইকেটের পিছনে মুশফিক নামের ধাইন্যা মরিচ। সারাদিন খালি প্যাক-প্যাক, প্যাক-প্যাক করতেই থাকে। আদব-কায়দার কোন বালাই নাই।

হঠাৎ ফোনের রিং...ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। ভারতীয় অতিথিবৃন্দ, একটু প্লিজ, ফোনটা রিসিভ করি। হয়তো আপনাদের জন্য আরও নতুন আদর-আপ্যায়নের আয়োজনের খবর আসছে।

- হ্যালো?

- হ্যালো বাবু ভাই? আমি মুশফিক, ধাইন্যা মরিচ।

- আমার নাম্বার পেলেন কোথায়? আপনি অনেক দিন বাঁচবেন, আপনার কথাই লিখছিলাম

- হ্যাঁ, শুনলাম আপনি নাকি ভারতকে স্বাগতম জানিয়ে লেখা লেখতেছেন, তাই নাম্বার জোগাড় করে ফোন দিলাম

- হ্যাঁ, তা তো লিখছি। আপনার কিছু দরকার?

- হ্যাঁ, সেই স্বাগতমের লেখায় একটা জিনিস একটু লিখবেন। আমাদের সাথে ভারতের খেলা কিন্তু এবার শনিবার। ওদের একটু কইয়্যা দিয়েন, ভারতের কপালে এবার শনিই আছে

ফোন রেখে দিলাম। দেখলেন তো কান্ড। কি আর বলার আছে। আমাদের মতো নম্র-ভদ্র মানুষের মধ্যে এই সব বেত্তমিজ পোলাপান যে কিভাবে পয়দা হলো, সেই চিন্তায় আছি।

হে সম্মানিত ভারতীয় ক্রিকেট দল, বাংলাদেশে আপনাদের স্বাগতম। আপনাদের ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক। বিশ্বের সবচেয়ে মালদার, সম্ভ্রান্ত ক্রিকেট দলকে আমাদের মাঝে পায়ে আমরা যারপরনাই আবেগে আপ্লুত। স্রস্টা আপনাদের সহায় হোন। এই বাংলাদেশী বেয়াদব, বখাটে ক্রিকেট গ্যাং এর হাত থেকে আপনাদের জানমাল, মানসম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব উপরওয়ালার হাতে ছেড়ে দিলাম। আপনাদের আদর সমাদরের সব দায়িত্ব আমাদের। তবে ইজ্জতের নিশ্চয়তা দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। ইজ্জত মাঠে মারা গেলে অনুগ্রহ করে ক্ষমা করবেন।


স্বাগতম, হে ভারতীয় ক্রিকেট দল
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১
নক্সভিল, টেনেসি
বাংলাক্রিকেট-ডট-কম ফোরামে প্রথম প্রকাশিত

৬ সেপ, ২০১০

আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রয়াত


টিভি চালু করলাম, বাংলাদেশের খবর চলছিল।  ডঃ এম এম মোখলেস জাতীয় নামের কে একজন কথা বলছেন, তার নিচে পরিচিতি লিখা শকুন বিশেষজ্ঞআমার হাসির রেশ না মিলাতেই প্রচারিত হলো আব্দুল মান্নান সৈয়দের মৃত্যুর সংবাদ। মানুষের অনুভূতিতে হাসি আর শোকের দূরত্ব খুবই কম।

আব্দুল মান্নান সৈয়দ একজন কবি,কথাশিল্পী,প্রাবন্ধিক ও গবেষক এক সময় লিখেছেন একধারে সংবাদ ও সংগ্রামের মতো বিপরীত ধারার পত্রিকায় সাহিত্যের প্রশ্নে বিভাজনে বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি তাই এই সময়েও একই সাথে তাঁর সাহিত্য কর্মের মূল্যায়ন প্রকাশিত হয় প্রথম-আলো, জনকন্ঠ, আজাদী ও সংগ্রামে সচলায়তন আর সোনারবাংলা ব্লগে তিনি একই সাথে প্রাসঙ্গিক লেখক হিসেবে আব্দুল মান্নান সৈয়দ সার্বভৌম।

টিভিতে অ্যাম্বুলেন্সে শুইয়ে রাখা মান্নানের মৃতদেহের ছবির পরপরই পর্দায় ভেসে এলো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মুখ। খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে গেলেন তার অনুভূতির কথা। আমার মনে পড়লো  এক সময় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছ থেকে জানা এক বন্ধুত্বের গল্প।

৪৬ বছরের দীর্ঘ বন্ধুত্ব। সময়ের এতো সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দুই বন্ধু নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে কেবল মৃত্যুই এই বন্ধুত্বের অবসান ঘটাতে পারে। মৃত্যু নিয়ে তাই দুই বন্ধু সায়ীদ আর মান্নানের মাঝে রসিকতা হতো- কে আগে যাবে? জার্মানীর গ্যেটে আর শিলারের বন্ধুত্বের উপমা দিয়ে মান্নান ঠাট্টা করতেন- কার আগে মৃত্যু আসে তার মাধ্যমেই ঠিক হবে এই দুই বন্ধুর মাঝে এদেশে কে ছিল গ্যেটে আর কে ছিল শিলার। আজ আমরা বাংলাদেশের শিলার কে হারালাম।  


আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রয়াত
৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০
নক্সভিল, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

১৫ আগ, ২০১০

আমেরিকার বাবরী মসজিদ



৯/১১ হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত টুইন টাওয়ারের কাছে ১০০ মিলিয়ন ডলায় ব্যয়ে
 গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম জুড়ে অনেকটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমেরিকার মাটিতে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতার ভিত্তিতে যে কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে যে কারো ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের সংবিধানিক অধিকাররের কথা ব্যক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশী বন্ধুদের ফেসবুকে ও বাংলাদেশের মিডিয়াতেও দেখি বিষয়টা বেশ গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে।

মসজিদ বিরোধীতাকারীদের বক্তব্য হচ্ছে ৯/১১ হামলার স্মৃতি ঘেরা এই এলাকায় মসজিদ নির্মাণ সেই হামলায় নিহতদের প্রতি অসন্মান দেখানোর সামিল। এছাড়াও সেই ঘটনায় যারা জীবন দিয়েছিলেন, তাদের পরিবারেরর সংবেদনশীল অনুভূতিতেও আঘাত হানবে গ্রাউন্ড জিরোর আশেপাশে মুসলিমদের উপাসনালয় নির্মাণের এই প্রয়াস । 

মসজিদের সমর্থনকারীদের বক্তব্য হলো সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখতে হলে সম্পুর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে গৃহীত এই মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পকে কোন ভাবেই বাধা দেয়া চলবে না। অনেকের আরো বক্তব্য হলো- এটি শুধু মসজিদ নয়, এটি হবে একটি কমিউনিটি সেন্টার সেখানে মসজিদের পাশাপাশি থাকবে সুইমিং পুল, জিম ইত্যাদি এবং ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এই কমিউনিটি সেন্টারের দুয়ার সবার জন্য খোলা থাকবে।

আইনগত অধিকার ও সামাজিক ন্যায় বিচারের প্রশ্নে এই মসজিদ নির্মাণে কারো আপত্তি থাকবার কথা নয়। কিন্তু ৯/১১ হামলায় নিহতদের পরিবার ও আমেরিকার নাগরিকদের অনুভূতির সংবেদনশীলতার প্রশ্নটি বিবেচনার দাবী রাখে। ইসলামের নাম ব্যবহার করে এই হামলা হয়েছিল। এখন যতই সকল মুসলিম খারাপ নয় জাতীয় বাণী দেই না কেন, এই হামলার সাথে মুসলিম ও ইসলামের নাম জড়িত থাকার বিষয়টি তো আর মুছে যায় না।

আমাদের অভিজ্ঞতা কি বলে? একাত্তরের গণহত্যা চালানো হয়েছিল ইসলামের দোহাই দিয়ে। আমাদের রাস্ট্রনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের আতঙ্কজনক রূপ কি আমাদের ভাবনায় আসেনি? তাই সংবেদনশীলতার প্রশ্নটি ভাবনার দাবী রাখে। বাংলাদেশে একুশের শহীদ মিনারের পাশে যদি কেউ উর্দু সাহিত্য পরিষদ কিংবা জাতীয় স্মৃতি সৌধের পাশে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মৈত্রী সংঘ বা বিহারী সাংস্কৃতিক সংসদ নির্মাণ করতে চাইতো, সেটা কি আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করতো না?

মসজিদ নিয়ে এই বিতর্ক মনে করিয়ে দিল ভারতের সেই বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক ও তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে আমেরিকার এই মসজিদ ইস্যুতে যেন জল ঘোলা করার অপচেষ্টা কেউ করতে না পারে- সেদিকে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
  আগামী দিন গুলোতে বাংলাদেশে যারা এই 
গ্রাউন্ড জিরো প্রসঙ্গটি আড্ডায় বা মিডিয়ার আলোচনায় আনবেন, আমেরিকার মানুষের এই সংবেদনশীলতার বিষয়টিও সহানুভুতির সাথে বিবেচনায় রাখবেন বলে আশা রাখি।

আমেরিকার বাবরী মসজিদ
১৫ই আগস্ট, ২০১০
নক্সভিল, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

৯ আগ, ২০১০

ব্রা মানেই বিপদ



এই ব্লগটি শিক্ষামূলক। গাড়ী চালনা, চক্ষু নিয়ন্ত্রন এবং ব্রা বিষয়ক সংযম সংক্রান্ত বেশ কিছু শিক্ষনীয় নীতিবাক্য আপনারা এখানে পাবেন।

আমি তখন আমেরিকার জর্জিয়ায় অজ পাড়াগাঁর এক সামরিক ঘাটিতে আছি। আমার ইউনিটেই আছে আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত সেনাসদস্য ডিন ডেভলিন। সিগারেট আর নারীলিপ্সার এক জীবন্ত কিংবদন্তি সে তার সেই কীর্তিকান্ডের গল্প পরে একদিন করা যাবে। আজ অন্য গল্প। ডিন ডেভলিনের কাজ তখন এক বিশাল হামভি (হামার গাড়ীর সশস্ত্র সামরিক ভার্সন) চালিয়ে সেই সেনা ঘাটির পথ ঘাট দাপিয়ে বেড়ানো। এই দেখে আমার শখ হলো সেই হামভি একবার নিজে চালিয়ে দেখা। আমাকে খুশী রাখতে ডিনের কোন আপত্তি নেই। আমিও আমার মিলিটারি বসদের বলে কয়ে আমার শখ মেটানোর পার্মিশন নিয়ে নিলাম। ব্যস, এক বিকেলে অফিস শেষ করে ডিনকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। ঘটনার সুত্রপাত এখানেই।

বেশ কিছুদুর হামভি চালিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। চালাচ্ছি আর বনজঙ্গল ঘেরা ঘাটির রাস্তার আশে পাশের বৈকালিক প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছি তখন গ্রীষ্মকাল। স্নিগ্ধ বিকেল। হঠাৎ দেখলাম বিকেলের সোনারোদে রাস্তার পাশের এক সবুজ ঘাসের লনে গোলাপী ব্রা পরিহিতা অর্ধবসনা এক তরুনী আধশোয়া ভঙ্গিতে সূর্যস্নান করছে। নারীলিপ্সু ডিনের মনে হলো এক্ষুনি গাড়ী থামিয়ে সেই অর্ধবসনাকে তার জিজ্ঞেস করা উচিত আমি কি কোন সাহা্য্য করতে পারি? আমি সেই গোলাপী ব্রার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই ভাবছিলাম দুনিয়ায় এতো কিছু থাকতে ব্যাটা ডিনের কেন মনে হলো যে তার কাছ থেকে সেই তরুনীর কোন সাহায্য প্রয়োজন এবং অর্ধবসনা হয়ে সূর্যস্নানের সাথে কোন ব্যাটা ছেলের সাহায্য করতে চাওয়ার সম্পর্কটাই বা কি। হঠাৎ এক ধাক্কায় সম্বিত ফিরে পেলাম। অতি মনযোগের সাথে ব্রা দেখতে গিয়ে রাস্তার বাঁকটাই খেয়াল করিনি। পনেরো-বিশ ফূট উঁচু এক রোড সাইন ততক্ষনে আমার হামভির ধাক্কায় পপাত ধরনীতল।

পুলিশ এলো। গাড়ীর তেমন কিছুই হয়নি। বিশালাকৃতির রোড সাইনের ধ্বংসসাধনই আমাদের ব্রা পর্যবেক্ষনের প্রধান পরিণতি। ঘটনার আকস্মিকতায় ব্রা, অর্ধবসনা তরুনী, বিকেলের সোনারোদ- সব কিছুই মন থেকে ধুয়ে মুছে গেল। পুলিশ পুলিশের মতো বিচার বিশ্লেষন করে নির্ধারন করলো এটি একটি প্রশিক্ষণকালীন সামরিক দুর্ঘটনা ব্যস, কেস সেখানেই খতম। আর কোন ঝামেলা রইলো না। আমরাও স্বস্তিতে বাড়ী ফিরে এলাম। তবে সেই থেকে শিক্ষা হলো গাড়ী চালাতে গিয়ে ব্রা দেখা মোটেই নিরাপদ কোন কর্ম নয়। 

চোর পালালে যেমন বুদ্ধি বাড়ে, তেমনি দুর্ঘটনার পর তা এড়ানোর যা যা কলাকৌশল আমার জানা ছিল তা সবই মনে পড়তে থাকলো। বাংলাদেশে গাড়ী চালানোর নির্ভুল কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক ড্রাইভার আমাকে বলেছিল, ব মানেই বিপদ, তাই ব দেখলেই ব্রেক। এই ব গুলো হলো বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাস্তায় বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর-ই সব বিপদের উৎস। বুড়া, বাচ্চা, বাছুর আর বাজারের আমজনতা গাড়ীর সামনে কখন কি করে বসে তার কোন গ্যারান্টি নাই। তাই বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর দেখা মাত্রই জলদি ব্রেক কষে গাড়ীর গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।  ব দেখে ব্রেক কষলেই সব মুশকিল আসান। আমি খুব ভালো ভাবে এই তত্ব মুখস্ত করে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝলাম ড্রাইভার সাহেবের তত্ত্বে বিশাক এক ফাঁক রয়ে গেছে। বতে ব্রা-ও হয়। তিনি যদি বুড়া, বাচ্চা, বাজার ও বাছুর এর সাথে ব্রা বিষয়ক সতর্কবানী যুক্ত করে দিতেন, তাহলে আমি আজ ব্রা দেখেই ব্রেক কষে দিতাম এবং ব্রা দেখতে গিয়ে আমার এই সামরিক দুর্ঘটনাও ঘটতো না।

ব্রেক কষে না হয় গাড়ীর নিয়ন্ত্রন হলো, কিন্তু মনেরর নিয়ন্ত্রনের কি ব্যবস্থা? এই বিষয়েও কিন্তু আমার কিছু জানা ছিল। বাবার বদলীর সুবাদে বছরের মাঝখানে গিয়ে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছি নতুন এক স্কুলে। নতুন জায়গা, নতুন স্কুল- সব কিছুই অচেনা। ধর্মশিক্ষা ক্লাসে তাই উদাস হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফেলে আসা স্কুল আর বন্ধুদের কথা ভাবছিলাম। ক্লাসের জানালা দিয়ে তাকালেই এক বাড়ীর ছাঁদ। কোন কুক্ষনে সেই ছাদে তখন স্নান সেরে ভেজা শরীরে কাপড় নাড়তে এসেছে এক কাজের বুয়া। খোদার কসম, আমার সেদিকে মোটেই নজর ছিলনা। আমি শুধু স্মৃতিকাতরতায় উদাস হয়ে জানালা দিয়ে আকাশ পানে চেয়েছিলাম।  কিন্তু ধর্মক্লাসের মৌলভী স্যার আমার বাহিরের দৃস্টি ও ভেজা শরীরে ছাদে বুয়ার আগমন একসাথে লক্ষ্য করলেন। যার মনে যেই খেয়াল। তিনি ক্লাস ভর্তি ছেলে মেয়ের সামনে আমার নাম ধরে বললেন, শোন মাইনুদ্দীন, মনে রাখবা চক্ষুরও জেনা আছে  এই নিয়ে সেই স্কুলে বাকী দিনগুলো আমার নানা টিটকারী ও গঞ্জনার মধ্যে জীবন কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু হায়, তবু মাইনুদ্দীন সেই কথা মনে রাখে নাই। চক্ষুর জেনা করতে গিয়েই তো আজ এই দশা।

জনকল্যাণের জন্য আমার এই শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা ব্লগে প্রকাশ করলাম। দেশে বিদেশে যেসব তরুন বন্ধুরা গাড়ী চালান তাদের জন্য পরামর্শঃ ব দিয়ে বিপদ কিন্তু শুধুমাত্র ৪টি নয়; ব দিয়ে বিপদ ৫টি। বুড়া, বাচ্চা, বাছুর, বাজার এবং ব্রা। আর সব কিছুর পাশাপাশি ব্রা দেখিলেও সাবধান! গাড়ী নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মনের উপরও নিয়ন্ত্রন থাকা চাই। কিন্তু যৌবনের মন কি আর কথা শোনে? তাই চাই চক্ষুর উপর নিয়ন্ত্রন। আফসোস, মাইনুদ্দীন মনে রাখে নাই। কিন্তু আপনারা মনে রাখবেনঃ চক্ষুরও কিন্তু জেনা আছে।

ব্রা মানেই বিপদ
৯ই আগস্ট ২০১০
নক্সভিল
, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

৬ আগ, ২০১০

সঙবাদ



খবরঃ
 জাতীয় সংগীতকে মোবাইল ফোনে রিং টোন হিসেবে এবং তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। (প্রথম আলো)

বুঝলাম আইনের ভিত্তিতেই এই আদেশ। কিন্তু রিট মামলা যে দায়ের করলো তার প্রাণে কি গান নাই? সঙ্গীত ভালোবাসার  জিনিস। দেশপ্রেমও ভালোবাসার জিনিস। ভালোবেসে তা আমি আমার ফোনে ব্যবহার করলে সমস্যা কি?  কিন্তু সে রকম আইনী শ্রদ্ধা দেখাতে হলে তো ফেসবুকের অনেকের প্রোফাইল ফটোতে রাখা জাতীয় পতাকার ছবিও নিষিদ্ধ করে দিতে হয়। সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা দেখিয়ে দুরত্ব বজায় রেখে চলা আর ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়ার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বললে আমি ভালোবেসে কাছেই টেনে নিতে চাইবো। পাড়ার মুরব্বী খালাম্মাদের আমি সন্মান দেখিয়ে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে দুরত্ব বজায় রেখে চলি। আর পাশের বাড়ীর সুন্দরী প্রেয়সীকে কাছে টেনে নিয়ে চুমু খাই। তুমি খাল্লামা হতে চাও নাকি প্রেয়সী?

খবরঃ দেশের সর্বত্র জামায়াতের নতুন সদস্য সংগ্রহ কমে গেছে, শুধু পাবনায় কমেনি (প্রথম আলো)

হেমায়েতপুর গারদ তো পাবনায়। তাইলে আর সদস্য সংগ্রহ কমবে কেমনে? হেমায়েতপুরের গারদে নিশ্চয়ই এবার তুমুল মাত্রায় জামায়াতের সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলেছে। দৃশ্যকল্পটা হতে পারে এরকমঃ
জামায়াত কর্মীঃ
  ও মতি মিয়া, তুমি কি জামায়াতের সদস্য হইতে চাও?
মতি পাগলাঃ অবশ্যই হইতে চাই। গারদ থেইকা বার হইয়া আমি ইনশাল্লাহ মাওলানা মনি সিং-এর নেতৃত্বে দেশে ইসলামী বিপ্লব করবো।
জামায়াত কর্মীঃ আলহাদুলিল্লাহ
, তুমি হইলা সদস্য নম্বর ৪২০।

খবরঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগের জনৈকা শিক্ষিকাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদাবনতি  বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। (প্রথম আলো)

সহযোগী অধ্যাপক সাহেব বিভাগীয় সভাপতি হইয়া যাবার পর আর নিশ্চয়ই ক্লাস নিতে পারতেছিলেন না। ছাত্রীর অভাবে তাই ধরছিলেন শিক্ষিকারে। এখন জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক হিসাবে জুনিয়র ক্লাসের কচি কচি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষকতা করবেন। ধর্ষকের জন্য তো এটা প্রমোশন! আসল প্রশ্ন হলোঃ এই অধ্যাপক মিয়ার চাকরি টিকলো কেমনে? নাকি ১০০ ধর্ষণের মানিক মিয়ার সেঞ্চুরী রেকর্ড দেখার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে  উনার যৌন নিপীড়ন এখন ও কিছু নয়, সবে তো মাত্র রানের খাতা খুললো!

খবরঃ নিঊইয়র্কের এক বাংলাদেশী সম্মেলনে সাবেক যাযাদি সম্পাদক শফিক রেহমান বলেছেন, বাংলাদেশের ডিবি পুলিশ পুলিশী হেফাজতে আমার গোপনাঙ্গ দেখতে চেয়েছিল। পুরুষ পুলিশ পুরুষের গোপনাঙ্গ দেখে কী আনন্দ পায়? (সাপ্তাহিক আজকাল)

বড়ই যৌক্তিক প্রশ্ন। স্মৃতিভ্রষ্ট হবার কারনে হয়তো শফিক রেহমানের আজ এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। কিন্তু এর উত্তর বোধহয় আমি জানি। বছর পনের আগের চালু থাকা এক গল্পের কথা মনে করা দরকার। গল্পটা এমনঃ এক আরব শেখ তাঁর বিলাস বহুল প্রমোদ ভবনে সুন্দরী বিলেতি যুবতীকে নিয়ে মৌজ়মাস্তিতে ব্যস্ত। মৌজ-মাস্তির এক একান্ত ঘনিষ্ট পর্যায়ে আরব শেখের গোপনাঙ্গের বিশাল আকৃতি দেখে বিমোহি্ত বিলেতি ললনা বিস্মিত কন্ঠে বললো, ওয়াওআরব শেখ তখন যুবতীর আরবী গ্রামাটিকেল মিসটেক সংশোধন করে দিয়ে বললেন,  আকৃতিতে এটা ওয়াও নয়, এটা আলিফ যতদুর মনে পড়ে, এই গল্প বাজারে এনেছিলেন শফিক রেহমান নিজেই তার যাযাদি কলামে। শফিক সাহেব হয়তো ভুলে গেছেন, কিন্তু ডিবি পুলিশ এখনো ভুলনি। তারা হয়তো একটু চেক করে দেখতে চেয়েছিল শফিক সাহেবেরটা ওয়াও না আলিফ।

সঙবাদ ১
৬ই আগস্ট, ২০১০
নক্সভিল, টেনেসি
সচলায়তন ব্লগে প্রথম প্রকাশিত

৫ আগ, ২০১০

অলক্ষুণে কবিতা

জীবনে কোন না কোন সময় সব মানুষই নাকি একবার হলেও কবি হয়। আমিও হয়েছিলাম। কাঁচাহাতে লেখা কৈশোরের দুর্বল কবিতা, কিন্তু তাতেই আমার জীবন ঝালাপালা। নব্বুই-একানব্বইয়ের দিককার ঘটনা। আমি সবে মাত্র মাধ্যমিকের পাট চুকিয়েছি। মফস্বল শহরে বন্ধুত্বের বৃত্তে চলছে জীবন। বন্ধুদের কেউ নব্য বিপ্লবী --- বামপন্থায় দীক্ষা নিচ্ছে। কেউ বা নব্য কবি --- কাব্য সাধনায় ব্যস্ত। এদের মাঝে বেমানান আমি ক্রীড়ামোদী তরুণ --- খেলাধুলো করে হেসে খেলে জীবন কাটানোর গোপন স্বপ্নে বিভোর। নব্য বিপ্লবী আর নব্য কবি বন্ধুরা তাদের বন্ধুচক্রে এই সৃস্টিহীন ক্রীড়া-প্রেমীর উপদ্রব মেনে নিতে নারাজ। দুই পক্ষের প্রভাবে আমি আধা-বিপ্লবী আর আধা-কবি হয়ে কোন কুক্ষণে যেন লিখে ফেললাম জীবনের প্রথম কবিতা। আর যায় কোথায়? কাঁচা হাতের লিখা এই কবিতাই আলী আবু আম্মুরীর অলক্ষুণে জুতো হয়ে দেখা দিল আমার জীবনে।

সেই সময়ই কোথা থেকে যেন একবার সঞ্জীব চৌধুরী নামে বিপ্লব আর শিল্পের যৌথ-সত্ত্বার এক মানুষ (তিনি তখনো দলছুটের সঞ্জীব হয়ে উঠেননি) এসে হাজির হলেন আমাদের বিপ্লবী আর কবি বন্ধুদের আড্ডায়। বন্ধুরা তাদের কৃতিত্বের গল্প শোনালো: আমার মতো সৃস্টিহীন মানুষও কিভাবে তাদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সম্প্রতি এক কবিতা ঝেড়ে ফেলেছে। কথায় কথায় সেই কবিতা পড়লো সঞ্জীব চৌধুরীর হাতে, যিনি তা পড়লেন এবং ফেরার সময় পকেটে ভরে নিয়ে চলে গেলেন ঢাকায়। সপ্তাহ খানিক পর জানা গেল ঢাকা থেকে ছাত্র ইউনিয়নের একুশের প্রকাশনা জয়ধ্বনিতে ছাপা হয়েছে আমার সেই অলক্ষুণে কবিতা। বন্ধুরা বলল, “ওরে, ছাড় তোর খেলাধুলা, তুই তো এখন কবি”।

বন্ধুরা হৈ হৈ করে সেই জয়ধ্বনির কপি নিয়ে গেল কলেজ সাময়িকীর দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপকের কাছে। তিনি সেটা আবার ছাপিয়ে দিলেন কলেজ বার্ষিকীতে। সেই কলেজ বার্ষিকী গিয়ে পড়লো কলেজের এক সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর হাতে, যে কিনা আবার সেই কবিতা নিয়ে উঠে গেল কলেজের সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আবৃত্তি মঞ্চে। সেই কবিতা এরপর আর কোথাও গিয়ে পড়লো না, বরং আমিই আহ্লাদে গদগদ হয়ে গিয়ে পড়লাম সেই সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর প্রেমে। প্রেমে তো পড়লাম, কিন্তু ভীরু মনে প্রেম নিবেদনের সাহস আর হয়ে উঠে না। একবার ভাবলাম কাব্যের ভাষায় বলি। কিন্তু কাব্যের কোলে আশ্রয় মিলল না - বেরুলো না একটি শব্দও। বেরুবে কিভাবে-বন্ধুদের সমতুল্য হবার তাড়া থেকেই না কোন কুক্ষণে লিখেছিলাম সেই একটা মাত্র কবিতা। অতঃপর ভাবলাম এবার না হয় সেই সুদর্শনা মেধাবী তরুণীর সমতুল্য হবার চেষ্টা করে দেখি যদি প্রেম নিবেদনের কোন কুল-কিনারা করা যায়। ব্যস, লাটে উঠলো আমার খেলাধুলা, বিপ্লব, কাব্য সবকিছুই। মন ডুবালাম পড়াশোনায়। তবে প্রেমের মরা যেমন জলে ডুবে না, আমিও ডুবলাম না। বরং ভেসে উঠলাম উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকায়। কি প্রেমেই না পড়েছিলাম! আগডুম-বাগডুম করে গিয়ে দাঁড়ালাম সেই মেয়ের সামনে। মনে বড় আশা, এককালীন সাময়িকীতে ছাপা হওয়া আমার কাব্য প্রতিভা আর আজকের পত্রিকায় ছাপা হওয়া আমার কৃতিত্বের ছবি মিলিয়ে আমাতে মুগ্ধ হয়ে সেই মেয়ে নিশ্চয়ই আজ নিজ থেকেই ভালোবাসা-ভালোলাগার গল্প-কথা কিছু বলবে। মেয়ে নিজ থেকেই বলল। ভালোবাসার গল্পই বলল। তবে সে গল্পের নায়ক অন্য কেউ। ভালোবাসার এই গল্পে আমার অবস্থা যেন সেই মক্কাবাসীর মতো যে মক্কায় থেকেও হজ্বের আসর ধরতে পারেনি।

হতাশ হৃদয়। খেলাধুলোয় আর মন বসলো না। ফিরে গেলাম বিপ্লবী বন্ধু আর কবি বন্ধুদের মাঝে কাব্য আর বিপ্লবের সন্ধানে। বন্ধুরা বলল, “ওরে, ছাড় তোর কাব্য আর বিপ্লব, তুই তো এখন মেধাবী”। অবশেষে সেই সিল নিয়েই পড়াশোনার নিরস জগতে মুসাফিরের মতো ঘুরে বেরাতে থাকলাম। আজও সেই পথে পথে ঘোরা সেই হয়নি। বরং এই দুপুর বেলায় কঠিন এক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পড়ার টেবিলে বসে মনে হল- আমার খেলাধুলার সেই আমোদিত জীবন কেড়ে নিলো এক অলক্ষুণে কবিতা। জীবনে ওই একবারই লিখেছিলাম। সেই প্রথম, সেই শেষ। এই সেই অলক্ষুণে কবিতা। শালার এই কবিতার মায়েরে বাপ!

দাবী

বায়ান্নতে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, ভাষা চাই।
বিধাতা ভাষা দিলেন।

একাত্তরে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, স্বাধীনতা চাই।
বিধাতা স্বাধীনতা দিলেন।

নব্বুইতে
দু’টো দাবী জানালাম বিধাতার কাছে।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যান করে বিধাতা বলেন, অপরটি বলো।
বললাম, গণতন্ত্র চাই।
বিধাতা গণতন্ত্র দিলেন।

যদিও বিধাতার মেনে নেয়া দাবীগুলোর
ঘটাতে পারিনি বিকাশ
তবুও এক গভীর রাতে
শত যুগের, শত শতাব্দীর প্রত্যাখ্যাত
সেই একটি মাত্র দাবী নিয়ে দাঁড়ালাম বিধাতার কাছে
বললাম, অন্ন চাই, অন্ন চাই, অন্ন চাই।
বিধাতা বলেন,
অন্ন নয়; অন্য কথা বলো।