৪ জানু, ২০০৯
এরশাদ বাংলার অলংকার
১৪ ফেব, ২০০৮
রক্তাক্ত মধ্য ফেব্রুয়ারির স্মৃতি
আজ মধ্য ফেব্রুয়ারি।
১৯৮৩-র এই দিনে শিক্ষাভবন অভিমুখে আয়োজিত মিছিলের উপর পুলিশের ট্রাক চালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয় জাফর, জয়নাল, আইয়ূব, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ নাম না জানা আরও বেশ কিছু ছাত্রকে। বছর দুয়েক পর এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হত্যা করা হয় রাউফুন বসুনিয়াকে।
নব্বুই-এর দশকে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে বেড়ে উঠার সময় পত্রিকার পাতায় স্মৃতিচারণ থেকেই জেনে ছিলাম স্বৈরশাসনের সূচনালগ্নের সেই প্রতিবাদ মুখর উত্তাল দিনগুলোর কথা। ভালোবাসা দিবসের উন্মাদনায় আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে সেই প্রতিবাদী সময়ের স্মৃতি, হারিয়ে গেছে সেই “রক্তাক্ত মধ্য ফেব্রুয়ারি” শব্দ-গুচ্ছটি।
সেই সময়ে স্মৃতি ছোঁয়া একটি কবিতা।
কবিতার নাম “তোমাকে মনে পড়ে যায়”। কবি মোহন রায়হান।
শিমুল মুস্তাফার কণ্ঠে আবৃত্তিতেই ফিরে পেয়েছি এই পুরনো কবিতা।
মধুর ক্যান্টিনে যাই
অরুণের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।
তোমার সেই সদা হাসিমাখা ফুল্ল ঠোঁট,
উজ্জ্বল চোখের দ্যুতি
সারাক্ষণ চোখে চোখে ভাসে
বুঝি এখনই সংগ্রাম পরিষদের মিছিল শুরু করার তাগিদ দিবে তুমি
ওই তো, ওই তো সবার আগে তুমি মিছিলে
কি সুঠাম তোমার এগিয়ে যাবার ভঙ্গিমা
প্রতিটি পা ফেলছ কি দৃঢ় প্রত্যয়ে
কি উচ্চকিত তোমার কণ্ঠের শ্লোগান
যেন আকাশ ফেটে পড়বে নিনাদে
হাত উঠছে হাত নামছে
মাথা ঝুঁকছে ঘাড় দুলছে চুল উড়ছে বাতাসে
ওই তো, ওই তো আমাদের ঐক্যের পতাকা হাতে এগিয়ে যাচ্ছ তুমি
মধুর ক্যান্টিনে যাই
নিত্য নতুন প্রোগ্রাম, মিছিল সভা বটতলা
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দুর্জয় শপথ
সামরিক জান্তার ছোবল থেকে
শিক্ষাজীবন, শিক্ষাঙ্গনের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার অঙ্গীকারে
ডাক দেই দেশবাসীকে
তোমারি মত নিরাপত্বাহীনতায়
প্রতিটি ছাত্রের দুর্বিষহ জিম্মীজীবন এখনো এ ক্যাম্পাসে
হলে গেটে গেটে পড়ে থাকে ভয়ংকর বিস্ফোরন্মোখ তাজা বোমা
প্রতিদিন চর দখলের মত হল দখলের হিংস্র মহড়া
গুলি ও বোমা ফাটার শব্দ
এখনো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ
এ অস্ত্রের উৎস কোথায়?
মধুর ক্যান্টিনে যাই
প্রতিদিন আমাদের জীবন হাতের মুঠোয়
প্রতিদিন হামলা রুখতে হয়
বসু, আজ সেই প্রতিরোধের সারিতে তুমি নেই
আজ বড়ই অভাব অনুভব করছি তোমার
শিক্ষাভবন অভিমুখে সামরিক শাসন ভাঙ্গার প্রথম মিছিলে তুমি ছিলে
রক্তাক্ত ১৪ই ফেব্রুয়ারির কাফেলায় তুমি ছিলে
৪ঠা আগস্ট সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের কবল থেকে
আমাদের পবিত্র মাটি রক্ষা করার সম্মুখ সমরে তুমি ছিলে
এমন কোন ধর্মঘট, হরতাল, ঘেরাও, মিছিল আন্দোলন নেই যে তুমি ছিলে না
সেই নৃশংস ঘাতক রাতেও
তুমি অস্ত্রধারীদের দুর্গের দিকে অবিচল যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলে
ঘাতক বুলেট ভেদ করে গেছে তোমাকে
কিন্তু তুমি পিছু হটোনি
তুমি বীর, তুমি সাহসী যোদ্ধা, তুমি সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান
যুগে যুগে সংগ্রামীদের অফুরান প্রেরণা
মধুর ক্যান্টিনে যাই
অরুণের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।
কাউন্টারের সামনে কতদিন
তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খেয়েছি
কতদিন তুমি আমাকে চায়ের পয়সা দিতে দাওনি
কতদিন চায়ের সঙ্গে একটি সিঙ্গারা বা কেকের আবদার করেছ
কতদিন তোমার সঙ্গে খোশগল্প হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছি
বসু, আজ সব কথা মনে পড়ে যায়।
রিপার বিয়েতে তুমি বলেছিলে
অ্যাকশনে আপনার আর আগে থাকার দরকার নেই,
আমরা তো আছি
বসু, তুমি রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে সে কথা প্রমাণ করে গেলে
বসু, তুমি আমার শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার একটি রক্তকরবী বৃক্ষ
মধুর ক্যান্টিনে যাই
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।
তোমার মৃত্যুর সেই নৃশংস ঘাতক রাত্রিতে
আমি ছিলাম ঢাকার বাইরে
তোমার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ আমি দেখিনি
তোমার মৃত্যুর খবর শুনে
বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল মন
তবু সেই রাত্রেই আড়াই-শত মাইল দূর থেকে
সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা দিয়েছিলাম
তোমার হত্যার প্রতিশোধ নিতে
তোমার খুনিদের রক্তে হাত রাঙ্গাতে
বসু, আমরা বহুবার তোমার হত্যার প্রতিশোধ নেবার শপথ গ্রহণ করেছি
অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে, শহীদ মিনারে, বটতলায়, বায়তুল মোকারমে,
সারাদেশ তোমার হত্যার বদলা চায়
কিন্তু এখনো তোমার খুনিরা প্রকাশ্যে সগর্বে ঘুরে বেড়ায়
এখনো তোমার ঘাতকেরা ক্ষমতার কালো কেদারায় বসে
রাইফেল তাক করে আছে আমাদের প্রতি
বসু, আমাদের শিক্ষানীতি এখনো বদলায়নি
সামরিক খাতে ব্যয় শিক্ষাখাতের চেয়ে আরও বেড়েছে
নতুন নতুন ক্যান্টনমেন্ট তৈরির পরিকল্পনা হলেও
সংস্কারের অভাবে জগন্নাথ হলের জীর্ণ ছাদ ধ্বসে
তোমার অনেক বন্ধু মারা গেছে
এখনো হলে হলে মেধা-ভিত্তিক সিট বণ্টন চালু হয়নি
বসু, তুমি এসবের পরিবর্তন চেয়ে জীবন দিয়েছ
কিন্তু আমরা এখন তোমার একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে পারিনি
বসু, আমরা তোমার কাঙ্ক্ষিত লড়াই চূড়ান্ত করতে পারিনি
আমরা তোমার হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারিনি
আমরা এখনো অজস্র বসু হতে পারিনি বলেই...
মধুর ক্যান্টিনে যাই
বসু, তোমাকে মনে পড়ে যায়।
খুব মনে পড়ে।
১৮ ডিসে, ২০০৭
ফিরে দেখা: সঞ্জীব চৌধুরী
সঞ্জীব চৌধুরী- আমাদের সঞ্জীব-দা'র কিছু ভিডিও ক্লিপ আমার হাতে এসেছিল। সবই মুলতঃ বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানের খণ্ডাংশ। এর মাঝে কিছু ছিল সঞ্জীব-দা'র অভিনীত সম্ভবত: একমাত্র নাটকের অংশবিশেষ। সেসব দিয়েই "ইন মেমোরি অব সঞ্জীব চৌধুরী" শিরোনামে ইউটিউবে ছোট ছোট ৮ পর্বের একটি ভিডিও সিরিজ আপলোড করেছি। তারই একটি এখানে সংযুক্ত করে দিলাম:
১১ মে, ২০০৭
ছোটদের সহজ ক্রিকেট অধিনায়কত্ব শিক্ষা
উৎসর্গঃ হাবিবুল বাশার
ছোট্ট বন্ধুরা, আজ আমি তোমাদের ক্রিকেট খেলার অধিনায়কত্ব করার সহজ নিয়ম শিখাবো। ক্রিকেট খেলা একটি মজার বিষয়। ক্রিকেট খেলায় অধিনায়কত্ব করা তো আরো মজার। তবে তার জন্য কিছু নিয়ম মুখস্ত করতে হয়। এসব নিয়ম মুখস্ত করে নিলে তোমারা যে কেউই ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হতে পারবে।
ভালো ভাবে বোলিং পরিবর্তন করতে হলে তোমাকে একটা তালিকা মুখস্ত করতে হবে। খেলার আগের রাত্রেই কে কোন ওভার বল করবে তার একটা তালিকা বানিয়ে যথাসম্ভব ভালো করে মুখস্থ করে নিবে। এই তালিকা মুখস্থ থাকলে খেলা চলাকালীন বোলিং পরিবর্তন খুব সহজ হয়ে যাবে।
৫০ ওভারের বোলিং তালিকা তো অনেক বড়—সেটার কিছু অংশ খেলার সময় তুমি ভুলে যেতেই পারো। তালিকার কোন অংশ হঠাৎ ভুলে গেলে একদমই ঘাবড়ে যাবে না। যদি তালিকার কোন অংশ মনে না থাকে, তবে সেই ভুলে যাওয়া অংশে ৬ষ্ঠ বোলার ব্যবহার করবে। কোন অবস্থাতেই ভুলে যাওয়া অংশে নিয়মিত বোলার ব্যবহার করে নির্ধারিত তালিকা গড়বড় করে ফেলবে না।
রক্ষণাত্মক ফিল্ডিং-এর একটা চার্ট বানিয়ে তা খুবই ভালো করে মুখস্থ করে রাখবে। এটা একবার ভালো করে মুখস্থ হয়ে গেলে ফিল্ডিং সেট-আপ নিয়ে সারাজীবনে আর কোন ঝামেলা থাকবে না। যে কোন খেলা এই একই ফিল্ডিং চার্ট ব্যবহার করে চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।
যদি আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর ইচ্ছে হয়, তবে ফিল্ডিং-এর চার্টটাকেই বজায় রেখে সব ফিল্ডারদের ২-পা করে এগিয়ে এসে দাঁড়াতে বলবে। যদি অতি আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর ইচ্ছে হয়, সেক্ষেত্রে সব ফিল্ডারদের অরিজিনাল ফিল্ডিং চার্টের অবস্থান থেকে ৪-পা ভেতরে এনে দাঁড় করাবে। তবে আক্রমনাত্মক ফিল্ডিং সাজানোর এই শখ যত পরিহার করে চলা যায় ততই মঙ্গল। মনে রাখবে, “ডিফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট অফেন্স”।
আজকাল ক্রিকেটবিজ্ঞ ব্যক্তিরা সবাই বলে, খেলার সময় মানসিক চাপে না ভুগে ক্রিকেট খেলাটাকে তুমি যত বেশী উপভোগ করবে, তোমার নিজের খেলাও তত ভালো হবে। অধিনায়কত্বের ব্যাপারেও এই এক-ই কথা প্রযোজ্য। খেলার পরিস্থিতি-ফরিস্থিতি এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা উপভোগ করে যাবে। বাকি সব কাজ সামাল দেয়ার জন্য ওভার প্রতি বোলার তালিকা এবং ফিল্ডিং সেট-আপ চার্ট তো হাতে থাকছেই।
মাঠে ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা অধিনায়কের অবশ্য কর্তব্য। মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের কাছে গিয়ে তাদের বোনের বিয়ে, বড় ভাইয়ের চাকরি-বাকরি, ছোটভাইয়ের পড়াশোনা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বদা কুশলাদি জিজ্ঞাসা করবে। মাঠে খেলা চলাকালীন সময়ে পালা করে সব খেলোয়াড়কে কাঁধে হাত রেখে স্নেহের সুরে “এই তুই পানি খাবি রে?” , “এই তুই বাথরুমে যাবি রে?” ইত্যাদি সৌজন্যতা অবশ্যই দেখাবে। এছাড়া একজন বোলার টানা ৩ ওভার বল করার পর তাঁর কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে “বেশ, বেশ” জাতীয় উদ্দীপনামুলক কথাবার্তা বলবে।
আক্রমনাত্মক মানসিকতা কেবল শত্রুতাই তৈরী করে। গান্ধীজীর মতো অহিংস নীতি পালন করে দল পরিচালনা করবে। ব্যাটসম্যানের ইনিংসের হায়াতের মালিক আল্লাহতায়ালা। কে কখন আঊট হবে তা খোদা তায়ালাই জানেন। তাই আক্রমনাত্মক মানসিকতায় দল পরিচালনা করে অহেতুক শত্রু বাড়িয়ে ফায়দা কি? মনে রাখবে, বিশাল বটবৃক্ষ ঝড়ে ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু শত ঝড়েও লতা গাছের কিছু হয়না। তাই লতা গাছের মত কোমল অধিনায়ক হবে—প্রতিপক্ষ খেলার মাঠে যতই ঝড় তুলুক, তাতে তোমার কিছুই আসে যাবে না।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রতিপক্ষের ভালো ব্যাটসম্যান ও বোলারদের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা দেখাবে। তুমি নিজে যত ভালো ব্যাটিংই পারো না কেন, একজন ভালো বোলার কোন না কোন ভাবে তোমার উইকেট নিয়ে নিবেই। সুতরাং, উইকেট হারাবার আগে তাড়াতাড়ি ২/৩ টা বাউন্ডারী মেরে যে কয়টা রান তোলা যায়-সেটাই ফায়দা। একইভাবে, তুমি যে ভাবেই ফিল্ডিং সাজাও না কেন, একজন ভালো ব্যাটসম্যান রান করবেই। সুতরাং বাউন্ডারী ঠেকিয়ে তার রান তোলার গতি যত কমনো যায় ততই মঙ্গল। মনে রাখবে, একজন ভালো ব্যাটসম্যান যদি লেংড়াতে লেংড়াতেও মাঠে আসে- সে কিন্তু সবসময় একই রকম বিপদজ্জনক। লেংড়া হোক বা খোড়া হোক, ফিজিক্যাল কন্ডিশন ইজ টেম্পোরারী, বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।
নামঃ আনিজা খাতুন, পেশাঃ ভিক্ষাবৃত্তি, এলাকাঃ ফার্মগেট
আর ফিল্ডিং সাজানি? আমি তো ফিল্ডিং সাজাইয়াই ভাত খাই। আমার লগের পিচ্চি পোলাপানগো ফার্মগেটে কারে কোন মাথায় খাড়া করাইলে ভিক্ষা বেশী পাওন যাইবো—হেইডা আমি ঠিক করি। এডা খেলার ফিল্ডিং সাজানির থেইক্কা কম কি? হেই ডরাইল্লা ভামের মতন ফিল্ডিং সাজাইলে আমার আর খাইয়া পইড়া বাচন লাগতো না। মাইনষে দয়া কইরা কে কখন ভিক্ষা দিবো—হেই আশায় বইয়া থাকলে না খাইয়া এতদিনে আমার পেটকি লাইগা যাইতো। আমার ভিক্ষার ফিল্ডিং হইলো গিয়া এটাকিং। পোলাপান সেট কইরা এমুন মতন লাগাইয়া থুই—হালার আমারে ভিক্ষা না দিয়া মদন তোমারা যাইবা কই? আপনে যত কিপটা ব্যাডাই হন না ক্যা, আমি আমার কাম ঠিক-এ সাইরা লই। অই ডরাইল্লা ভামের বদলে আমি ক্যাপ্টেনিং করলে খবর কইরা দিতাম--- এমন পেচকি মারা ফিল্ডিং সাজাইতাম, মাঙ্গের চান্দু, আমারে উইকেটটা না দিয়া যাইতা কই!!
তয় খালি একখান কথা—আমারে ক্যাপ্টেন বানাইয়া দলে নিলে আমার কিন্তু অইসব “ওয়ানডে ক্যাপ” দিয়া পোসাইবো না। আমার লাগবো “ওয়ানডে ওড়না”। কইয়া দিলাম কিন্তু।
১১ই মে, ২০০৭
অস্টিন, টেক্সাস
বাংলাক্রিকেট-ডট-কম ফোরামে প্রথম প্রকাশিত
২০ এপ্রি, ২০০৬
একটি বিশেষ অসমাপ্ত সাক্ষাতকার
চট্রগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়াম। বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্ট চলছে। বাইরে বইছে উতাল হাওয়া। মেঘের প্রবল গর্জন। সেই সাথে আকাশ ভেঙ্গে নেমেছে বৃস্টির অবিরাম ধারা। খেলা থেমে আছে। ড্রেসিং রুমের বারান্দায় বসে আছে আশরাফুল। উদাস মনে তাকিয়ে দেখছে মেঘলা আকাশ। উদাসী আশরাফুলকে দেখে তার পাশে গিয়ে বসলেন সাংবাদিক রাবিদ ইমাম।
রাবিদঃ আশরাফুল, একা বসে করছো কি?
আশরাফুলঃ এইতো রাবিদ ভাই, বসে বসে বৃস্টি দেখছি, মেঘলা দিন, মনটা উদাস
রাবিদঃ উদাস হবার মতো কতো কান্ড-ই তো ঘটছে-- মনতো উদাস থাকবেই। আমি তো দেখে ভাবলাম মিস্টি রোমান্টিক কোন কবিতা লিখতে বসেছো বুঝি
আশরাফুলঃ ধুর যা, কি যে বলেন। মিস্টি রোমান্টিক কবিতা আমি কি লিখবো? আমি কি লিখালিখি করি নাকি? তবে মিস্টি রোমান্টিক কিছু শট কিন্তু খেলার চেস্টা করছি আমি আজকাল।
রাবিদঃ খেলার প্রসঙ্গ-ই যখন এল, তবে এসো আলতু ফালতু কথাবার্তা রেখে তোমার একটা ফরমাল ইন্টারভিউ নেই।
আশরাফুলঃ ঠিক আছে, আলতু ফালতু কথাবার্তা সব বাদ- একদম ফরমাল ইন্টারভিউ।
রাবিদঃ ভেরি গুড। মনে রেখো, বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবে তুমি এখন ইন্টারভিউ দিচ্ছো। আচ্ছা, তোমার খেলায় অবস্থা এখন কেমন? শ্রীলংকার সাথে খেলার পর থেকেই অফ ফর্ম মনে হচ্ছে।
আশরাফুলঃ আসলে সব খেলোয়াড়ের জীবনেই কখনো কখনো এরকম খারাপ সময় আসে, কিছুতেই আর কিছু হয় না। কিন্তু আমার সমস্যাটা একটু কেমন যেন অন্যরকম। আমার অফ ফর্ম বা খারাপ সময়টাই নরমাল। আর কখনো কখনো ভাল ফর্ম আসে- তখন আর কিছুতেই কিছু হয় না- পিটাইয়া সবাইরে পোতাইয়া ফালাই।
রাবিদঃ কেনিয়ার সথে কিছু হল না; আমরা তো ভাবলাম ভাল অপোনেন্ট না হলে তোমার খেলার রুচি আসে না। তাই আশা ছিলো অস্ট্রেলিয়ার সাথে তোমার খেলার রুচি আসবে, তোমার গায়েবি ফর্ম আবার নাযিল হবে বা তোমার ভাষায় “পোতাইয়া ফালাইবা”। কিন্তু হলো না তো?
আশরাফুলঃ আরে রাবিদ ভাই, দেখলেন কিছু হেভি একখান ঠাডা পরলো। ইস, এই ঠাডা-ডা নিয়া যদি গিলেস্পির মাথায় নিয়া ফালাইতে পারতাম!!
রাবিদঃ আশরাফুল, আশরাফুল। আলতু ফালতু অপ্রাসঙ্গিক কোন কথা না। বললাম না এটা ফরমাল ইন্টারভিউ হচ্ছে।
আশরাফুলঃ ও আচ্ছা, সরি। জানি যে এটা ফরমাল ইন্টারভিউ হচ্ছে- হঠাৎ করে কি যে হইলো, ফালতু কথা বলা শুরু করলাম।
রাবিদঃ যাই হোক, খেলার প্রসংগে আসি। অস্ট্রেলিয়ার সাথে এসব কি খেলছো?
আশরাফুলঃ আসলে এটাকিং শট খেলে তো অনেক আউট হলাম। তো এবার ভাবলাম এটাকিং বাদ দিয়া মিস্টি রোমান্টিক শট খেলি। কিন্তু দেখা গেল- অস্ট্রেলিয়ানরা খুব-ই বেরসিক। রোমান্টিকতার কোন দাম দেয় না। বর্বর পাষন্ডের মতো আমাকে খালি উপূর্যপরি আউট করে দেয়।
রাবিদঃ তা তুমি হঠাৎ করে ক্রিকেটে এই রোমান্টিকতা আমদানি করতে গেলে কেন?
আশরাফুলঃ হি হি হি, দেখেন দেখেন গ্রাউন্ডসম্যান একটা আছার খাইছে। লুঙ্গি লইয়া মাঠে পানির মইধ্যে চিতপটাং।
রাবিদঃ আশরাফুল, আশরাফুল। ফরমাল ইন্টারভিউ’র মাঝে আবারো বাজে কথা? এসব হচ্ছেটা কি?
আশরাফুলঃ সরি ভাই, আমি জানি যে এটা ফরমাল ইন্টারভিউ এবং দলের মান সন্মান এর সাথে জড়িত। কিন্তু কখন যে মনোযোগ হারিয়ে আবার ফালতু কথা বলার ইচ্ছা চলে এলো!!
রাবিদঃ যাই হোক, তোমার নতুন কিউট, মিস্টি, রোমান্টিক শট খেলার প্রবনতার কথা বলছিলে।
আশরাফুলঃ ও হ্যা, মডেল মোনালিসার সাথে ফটোসেশন করার সময় মোনালিসা বলেছিলো যে আমার কিউট চিকি শট গুলো ওর খুব পছন্দ। তাই প্ল্যান করেছিলাম অস্ট্রেলিয়ার সাথে দুহাতে এই কিউট চিকি রোমান্টিক শট গুলো খেলবো আর মুখে রাখবো মিস্টি একটু হাসি। স্টেডিয়ামে দর্শকদের মনে হবে- খেলার মাঠ নয়, তারা যেন এসেছে কোন এক ডেটিং স্পটে।
রাবিদঃ মডেল মোনালিসা একটা কথা বললো আর তুমি অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সাথে সেই শট খেলা শুরু করে দিলে?
আশরাফুলঃ আসলে তা নয়, আমার খালাতো বোনের ছেলে আদনান আর বাড়ীওয়ালার ছেলে রিফাতের সাথে বাসার পিছনের উঠানে যখন খেলছিলাম- বেশ সুন্দর হচ্ছিলো কিন্তূ শট গুলো। শুধু অস্ট্রেলিয়ার সাথে এসেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
রাবিদঃ আদনান-রিফাত আর অস্ট্রেলিয়া এক হলো? তুমি কোচের সামনে নেটে প্রাকটিস করেছিলে এই রোমান্টিক শট?
আশরাফুলঃ হে হে হে!! ধর ওইটারে, ভালো কইরা চুবা পানির মইধ্যে। দেখলেন রাবিদ ভাই, বলবয় গুলা বৃস্টির পানির মধ্যে একটা আরেকটারে ধইরা চুবাইতেছে—ভেরি ফানি।
রাবিদঃ আশরাফুল, আশরাফুল। এতো অমনোযোগী হলে হবে? কতবার মনে করিয়ে দিব যে এটা ফরমাল ইন্টারভিউ। বারবার একই ভুল করছো?
আশরাফুলঃ সরি ভাই, জানি যে এটা ফরমাল ইন্টারভিউ। দলের কথা মাথায় রেখে দায়িত্বশীল ভাবে ইন্টারভিউ দিতে হবে। হয়তো এই দায়িত্বশীলতার চাপেই সব গুলিয়ে ফেলে একটু পর পর সব ভুলে আলতু ফালতু কথার প্রসঙ্গ আনছি।
রাবিদঃ যাই হোক, বলো কি বলছিলে।
আশরাফুলঃ ও হ্যা, নেটে তো আর সব কিছু প্রাকটিস করার সময় হয়ে উঠে না। দলের সবার প্রত্যাশা আমি অবস্থা বুঝে দায়িত্ব নিয়ে খেলি, আমজনতা দর্শকদের প্রত্যাশা “বুম-বুম আশরাফুল”, মডেল মোনালিসার প্রত্যাশা কিউট রোমান্টিক শট। এই সেন্সিবল ক্রিকেট, বুমবুম ক্রিকেট আর কিউট রোমান্টিক- সব মিলিয়ে খেলতে গিয়ে আমি নিজেই “হাবা মতিন” হয়ে গেলাম। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
রাবিদঃ এবার ওয়ান-ডে সিরিজ শুরু হচ্ছে- ভালো কিছু দেখার আশা কি আমরা করতে পারি?
আশরাফুলঃ ওয়ান-ডে ম্যাচে ভালো খেলার চেস্টা...... হি হি হি, দেখেন দেখেন বৃস্টির মধ্যে খারাইয়া ডিউটি করতে গিয়া পানিতে ভিজ্যা পুলিশ গুলার কি নাকানি চুবানি অবস্থা।
রাবিদঃ আশরাফুল, আশরাফুল। বারবার একই ভুল? তুমি না কথা দিয়েছো দলের সন্মানের কথা মাথায় রেখে সিরিয়াসলি ইন্টারভিউ দিবে- অথচ প্রতিবারই সব ভুলে গিয়ে একই কাজ করছো?
আশরাফুলঃ সরি রাবিদ ভাই। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও ফরমাল ইন্টারভিউ। আমাদের সবাইকে অত্যন্ত সতর্কভাবে ভাবনা চিন্তা করে দায়িত্বশীল কথা বলতে হবে। আশা করছি এবার থেকে ফালতু প্রসঙ্গ এড়িয়ে ভাল ভাবে কথা বলতে পারব এবং আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো।
রাবিদঃ একবার দুবার তো নয়, বারবারই একই ভুল হচ্ছে। তবে তোমার কথা শুনে এবার মনে হচ্ছে তোমার মধ্যে ম্যাচিউরিটি এসেছে ও তুমি তোমার ভুল ধরতে পেরেছ। যাই হোক, বলো, ওয়ান-ডে সিরিজ নিয়ে তোমার প্ল্যান কি?
রাবিদঃ তুমি মারমুখী আলী আকবর খান হয়ে গেলে দলের হাল ধরে রেখে খেলবে কে- এটা নিয়ে টিমে কোনো আলোচনা হয়েছে?
আশরাফুলঃ ওই শালা নাম, নাম। পা পিছলাইয়া পড়বি তো। দেখেন তো কান্ড! খেলে বন্ধ তাও বৃস্টির মইধ্যে গাছের ভিজা ডলে চইড়া মাঠের দিকে তাকাইয়া আছে। এসব পাগলা দর্শক নিয়া হইছে আরেক জ্বালা। জানের মায়া নাই, খালি ক্রিকেট আর ক্রিকেট।
রাবিদঃ আশরাফুল, আশরাফুল। আবারো একই ভুল? আবারো ফালতু প্রসঙ্গ?
(হাবিবুল বাশার এসে বসলেন আশরাফুল আর রাবিদ এর সাথে)
আশরাফুলঃ সরি ভাই, অতীতের সব ভুল থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের ইন্টারভিঊ পড়ার জন্য দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। আপনি দোয়া করবেন, আমি যাতে সবার কথা মনে রেখে দায়িত্বশীলতার সাথে এই ইন্টারভিউ শেষ করতে পারি।
রাবিদঃ ঠিক আছে। হাবিবুল এখন আমাদের সাথে আছে, সে তোমাকে সুন্দর ভাবে গাইড করতে পারবে যাতে তুমি ভালো ভাবে ইন্টারভিউটা দিয়ে পারো।
হাবিবুলঃ আশরাফুল, রাবিদ ভাই তোর সিরিয়াস ইন্টারভিউ নিচ্ছে আর তুই কিনা এর মধ্যে আলতু ফালতু প্রসঙ্গ আনছিস? তোর ইন্টারভিউ পড়ার জন্য মানুষ বসে থাকে- আর তুই এটা নিয়ে এমন খামখেয়ালি করিস? তুই পারবি। তুই ভাল ভাবে কথা বল- আমি তোর পাশে থেকে তোকে গাইড করব।
রাবিদঃ আচ্ছা বলছিলাম, তোমার মারমুখী খেলার সাথে মিল রেখে দলের গেম প্ল্যান কি হবে?
হাবিবুলঃ আশরাফুল, দেখ দেখ অস্ট্রেলিয়ান মেয়ে সাপোর্টারগুলা বৃস্টির মধ্যে কাপড় খুলে ভিজতেছে।
আশরাফুলঃ আরে জোশ, জোশ। ওরে খাইছে, কি বড় আরেকটা ঠাডা পড়লো।
হাবিবুলঃ তুই বাজ পড়া কে ঠাডা বলিস কেন?
আশরাফুলঃ আরে রাখেন সুমন ভাই, এমন জোরে জোরে পড়তাছে- এটা ঠাটা না, রাম ঠাডা
(ইন্টারভিঊ’র কথা ভূলে হাবিবুল আর আশরাফুল অস্ট্রেলিয়ান ফ্যান, ঠাডা পড়া আর বাজ পড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তাদের এই কান্ড দেখে ব্জ্রাহতের মত নির্বাক হয়ে বসে রইলেন ডাকসাইটে সাংবাদিক রাবিদ ইমাম)
অস্টিন, টেক্সাস
বাংলাক্রিকেট-ডট-কম ফোরামে প্রথম প্রকাশিত


